Thursday, 23 February 2023

মনকলি - পর্ব ৫

মনকলি --৫
ক্রমশ রাহুলের গাড়ি ছুটে চলেছে শান্তিনিকেতনের দিকে। গুসকরা পার হয়ে গেলো আর কিছুটা এগোলেই বোলপুর। কোপাই নদীর কাছে এসে গাড়ি একটু থামালো। আকাশে আজ পূর্ণ চাঁদ  রাহুুল নামলো কোপাইয়ের ধারে। নেমে গেলো তরতর করে নদীর একদম কাছে। পাথর কেটে কেটে তিরতির করে এগিয়ে যাচ্ছে নদীটা রাহুল দেখলো চাঁদের ছায়াটা স্থির হয়ে আছে , বড়ো শান্ত রূপ তার। মনে হলো কোথায় যেনো চাঁদের  এই ছায়ার সাথে  মিল আছে সুচরিতার। একান্ত নীরব নীরবতার মধ্যে দিয়ে পরিপূর্ণ তার হৃদয়ের ভালোবাসা। 
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো,রাহুল দেখলো সুচরিতার ফোন। ছেলেমানুষের মতন উচ্ছ্বসিত হয়ে রাহুল, আমি আসছি সুচি আমি এখনই আসছি। আমাকে যে আসতেই হবে তোমার কাছে। 
সুচরিতা কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে গেলো তার বউয়াদার উচ্ছ্বসিত গলা শুনে ভাবলো, এতোদিনে কি তার অপেক্ষার দরজায়
 সত্যি বসন্তের বাতাস লাগলো? কিন্তু মনকলি ও য অনেক আশা নিয়ে পুরুলিয়ায় গেলো চাকরি নিয়ে, ওকে যে তো সুচরিতাই বলেছিল যে তোর ভালোবাসা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে,
 তোকে শুধু খুঁজে নিতে হবে। 
কিন্তু সে কি করবে!  তার তো কিছুর করার নেই  তখনও পর্যন্ত তো সে জানতো বউদার মন জুড়ে
শুধু মনকলি আছে। তাই সেদিন তার প্রেম মর্যাদা  পায়নি  বউদার কাছে, আজ সে কি করবে! কিছু  তো করার নেই  কিছুটা  অপমানের সাথে হলেও বউয়াদা সত্যি তাকে ভালোবাসা অর্পণ করে তবে তা ফিরিয়ে দেওশার ক্ষমতা তার নেই। 
একটু পরেই বেল বাজলো  তারমানে বউদা এসে গেছে। শান্ত  ধীর পায়ে গিয়ে সে দরজা খুলে  দিলো, রাহুল প্রথমে একটু দাঁড়ালো তারপর এগিয়ে এসে দু'হাতে সুচরিতা কে বুকের কাছে টেনে আনলো তারপর তার মুখটা দু,হাতের তালুতে ধরে বললো, আমাকে গ্রহণ করবে তো?  
আমি তোমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে বুঝতে পারলাম মনটা আমার পুরোপুরি  বদলে গেছে। 
উচ্ছল দাম্ভিক কোনো মুখের আড়াল থেকে একটা শান্ত স্নিগ্ধ সুন্দর দুটো কালো চোখের মায়াভরা দৃষ্টি ভেসে উঠছে। মনে হলো তখন, উচ্ছল ঝর্ণা পাহাড়ের অনেক বাঁকের ফাঁকে হারিয়ে যায় কি শন্ত নদীটা তিরতির শব্দে বয়ে চলে। 
সে সুচরিতা কে দু'হাতের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বললো, নেবে তো আময়? 
সুচরিতার এতোদিনে বাঁধ ভেঙে গেলো, সে বউয়ার বুকে মাথা রেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো। 
বউদা তার মাথায় হাত রেখে বললো, আমার এ ভালোবাসা অন্তর থেকে উঠে আসা পবিত্র ভালোবাসা।
কিন্তু মনকলি কে কি বলবে বউদা?  
আমার তো কিছু জবাব দেওয়ার নেই সুচরিতা, 
আর কেনোই বা জবাব দেবো বলো তো? 
হয়তো তুমি বলবে আমিই বা কেনো আসবো তোমার কাছে? জবাবে আমি বলবো আমি তোমাকে কোনো অসম্মান করিনি বা বলিনি যে তুমি আমার যোগ্য নও খুব শান্ত ভাবে নিজের কথা জানিয়েছিলাম। আসলে রোজ তোমাকে দেখতাম বলে বা তোমার হাতের প্রচুর যত্ন পেতাম বলে হয়তো নিজের মনকে বুঝতে পারিনি, ধরে নিয়েছিলাম এ যত্ন গভীর বন্ধুত্বের অঙ্গীকার। কিন্তু যে মুহূর্তে তোমাকে ছেড়ে চলে এলাম তখন শুধু তুমি আমার মনে জুড়ে বসলে, মনকলি কোথায় হারিয়ে গেলো। 
নিজেকে নিজে বলছিলাম, ' এ আমি কি করলাম!  নিজেকে নিজে বুঝতে পারিনি আর পারলামনা আর একজনের গভীর ভালোবাসার মর্যাদা দিতে। তখুনি তেমার কাছে আসতে পারছিলাম না কারণ লজ্জা আর অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছিলাম। যে নিজে এসে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল তাকে কেনো ফিরিয়ে দিলাম!  বড়ো বোকা আমি নিজেই বুঝিনি নিজেকে আর একজনের ভালোবাসায় মূল্য দিতে পারলামনা। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবেনা তো! 
কি করে ফিরিয়ে দে বলো তো!  সেই কোন ছোটবেলা থেকে ভালোবেসে আসছে, আজ যখন সে নিজে এসে কাছে দাঁড়িয়ে আছে তাকে ফিরিয়ে দেবার মতন ক্ষমতা আমার নেই। শুধু মনকলির সাথে বন্ধত্বটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। 
কেনো?  আমার জন্যে?  আমার মনের ঘরটা যে ছোটো সে ঘর থেকে একবার কেউ বেরিয়ে গেলে আর দ্বিতীয় বার ঢোকার জায়গা থাকেনা। 
কিন্তু আমি যে ওকে বলেছিলাম, বউয়াদা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে, তুই পুরুলিয়ায় যা খুব সম্ভব বউয়াদা পুরুলিয়া গেছেন। 
আচ্ছা সুচরিতা এ উত্তরের ভারটা তুমি আমার ওপর দাও, যা সত্যি আমি তাই বলবো  আর তুমি যে নির্দোষ তাও বলবো যদিও এতো  কিছু  বিশ্লেষণ করে বলার জন্য আমরা বাধ্য নই ওর কাছে। বওয়া  সুচরিতাকে আরও কাছে টেনে ওরা কপালে পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বললো, কি মেয়েরে বাবা!  কখন এসেছি এতোটা পথ ধরে,এক কাপ চাও দিলো না।আবেশে সুচরিতার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল, বউয়াদার কথা শুনে   নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য ছটপট করে উঠে বললো, আরে এরকম করে ধরে রাখলে চা করবো  কি করে?  
তা আমি জানিনা। তারপরই হঠাৎ  ওকে গভীর আবেগে কাছে টেনে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে চোখ, ঠোঁট, গলা আকুল চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগলো, এই আমার ভালোবাসা, এই আমার সব, তোর জন্যই আমার অপেক্ষা ছিলো রে শুধু বুঝতে দেরি হয়ে গেলো। 
ভালোলাগায় সুচরিতার মুখ ঢলে পরেছিল বউয়াদার বুকের ওপর, মনে হচ্ছিল তার কোনো জ্ঞান নেই। জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো শুধু আদরে পেট ভরবেনা, চা টা করে আনি আগে। 
ক্রমশ 

Tuesday, 21 February 2023

অমর ২১

অমর ২১
পারমিতা চ্যাটার্জি 




২১ শে ফেব্রুয়ারী আমাদের বাঙালিদের কাছে এক অন্যতম গৌরবান্বিত দিন। বংলা ভাষাকে বাঁচাবার জন্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সেদিন লড়াই করেছিল বাংলার দামাল ছাত্র সংগঠন। 
লক্ষ্য ছিল একটাই মাতৃভাষা কে বাঁচিয়ে রাখার এক অদম্য প্রয়াস। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতন। এই ভাষায় আমরা প্রথম মা কে মা বলে ডাকি। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষা যখন বলপূর্বক পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয় তখনই শুরু হয় বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। যা ভাষা আন্দোলন বলে পরিচিতি লাভ করে। 
এই লড়াই চালিয়ে যেতে বহু রক্তক্ষরণ হয়, খালি হয় বহু মায়ের কোল,  কিন্তু দামাল ছেলেরা লড়াই থামায় নি। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তারা জয় ছিনিয়ে এনেছিল সে জয়ের নাম অমর -২১। 
সে সময় একটা বাক্য বহুল প্রচার হয়েছিল " আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারী।এই দেশের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের পাশের দেশ বাংলা দেশের স্বপ্ন ও ঐতিহ্য। সেদিনের ইতিহাসের পাতায়  ছিলো নিরলস সংগ্রাম,  আত্মত্যাগ, ও হার না মানার এক প্রবল মনোবল। যে সব যোদ্ধাদের নাম আজও লেখা আছে বঙ্গমাতার ভাষাকে মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার তাদের নাম হলো, রাফিক,সালাম বরকত ও আবদুল জাব্বরেরা। 
উর্দু ভাষাভাষী পশ্চিম পাকিস্তান বাংলা ভাষায় অধিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ছিলো রুষ্ট। বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে তাই নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। আন্দোলনরত ছাত্র ও সমাজকর্মীদের ওপর বর্বর পুলিশের লাঠি ও নির্মম গুলিবর্ষণ শুরু হয়। পুলিশের এই নির্মম গুলিবর্ষণে রফিক, সালাম, আবদুল জব্বার, বরকত ও শফিয়ুল সহ অনেক তরুণ শহিদ হন। তাই এই দিনটিকে শহিদ দিবসও বলা হয়। 
এরপর অনেক জল বয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অক্লান্ত লড়াই ও আত্মত্যাগের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, যে দেশের মূল ভিত্তি ছিলো বাংলা ভাষা। শুধু মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাষা আন্দোলন কে কেন্দ্র করে এক নতুন দেশের জন্ম বোধহয় ইতিহাসের পাতায় এক বিরল দৃষ্টান্ত। 
আজ ঐতিহাসিক  ২১ শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রূপে সমগ্র বিশ্বে পালিত হয় এও এক বিরাট গৌরবান্বিত জয়। ভাষার জন্য এমন লড়াইকে বিশ্ব জানায় কুর্নিশ প্রতি মুহূর্তে। এই দিন শুধু লড়াই নয় ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আত্মত্যাগ, নিরলস সংগ্রাম এই মহান ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। 
কুর্নিশ জানাই রফিক, সফিউল, বরকত ও আবদুল জব্বাররের মতন অজস্র তরুণ ছাত্র ও সমাজকর্মীদের যাদের রক্তে রাঙা হয় আজও ২১ শে ফেব্রুয়ারী অমর ২১ নামে এক মহান আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সমগ্র বিশ্বের দরবারে। 
জানাই সেলাম অমর ২১। 
জানাই সেলাম সেই সব অমর ভাইদের যারা মাতৃভাষাকে সম্মান দিয়ে, মর্যাদা দিয়ে এই নিরলস সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে সফল করেছিলেন ভাষা আন্দোলন। 

Thursday, 16 February 2023

আমি আছি

কবিতা
আমি আছি
পারমিতা চ্যাটার্জী।

ভালোবাসার আকাশটা আজ বর্ণময়,
বসন্তের  প্রাঞ্জল  অনুভূতিতে
সজ্জিত রক্তরাগী মনটা
আজ নিভৃতের রেখা পেড়িয়ে 
বাইরে  এসে দাঁড়িয়েছে।
কোকিলের কুহুতানে গলা মিলিয়ে
নিভে যাওয়া কণ্ঠ কখনও সন্ধ্যারাগে
কখনও ভোরের রাগিনীর উন্মাদনায়
বেজে  ওঠে  নতুন সুরে।
আকাশের আকুলতা বাতাসের সমারহ
ছোয়া লাগায় মনের আনাচে কানাচে।
প্রেমে উচ্ছল মনটা বসন্তের বর্ণময় ছটায়
চিৎকার করে ডেকে ওঠে তুমি কোথায়?
ফাগুন প্রেম হেসে ওঠে কল্‌কলিয়ে
এইতো আমি আছি  জড়িয়ে   তোমায়,
অবগুণ্ঠন খুলে  দেখে নাও,
গভীর অন্তর স্থলে সে যে বলছে
আমি আছি আমি আছিতো।।

Tuesday, 14 February 2023

মধুর মিলন

মধুর মিলন 
পারমিতা চ্যাটার্জি 

আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে।  নবমিতা আপনমনে  হাসে। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসের ফাঁকে বন্ধু দের  গল্প শোনে কার স্বামী  বা প্রেমিক কাকে কি দিয়েছে। নবমিতা প্রার্থনা করে  ওদের  এই হাসিখুশি মুখটা যেনো  চিরকাল  থাকে। ওর মতন যেনো হাসির আড়ালে বেদনাকে লুকিয়ে রাখতে না হয়। 
তার বিয়ে হয়ে গেছে। নামেই বিয়ে হয়েছে। ফুলশয্যার দিন তার স্বামী তাকে জানিয়ে দেয় যে এ বিয়েটা সে বাবা মায়ের ইচ্ছেতে করেছে, তাছাড়া আরও বলে সে তো অনেক ছোটো এতো ছোটো বয়েসে পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট থাকা সত্বেও সে কেনো বিয়ে করে নিলো, কেনো আরও পড়াশোনা করলোনা?  তার স্বামী তার থেকে আট বছরের বড়ো। ডক্টোরেট করে ইউনিভার্সিটির লেকচারার তাছাড়াও পোস্ট ডক্টরেট করছে। তার আন্ডারে  বেশ কিছু স্টুডেন্ট থিসিস করছে। হয়তো তার মনের মতন নিজের পছন্দের কেউ আছে। ফুলশয্যার রাতে ফুল দিয়ে সাজানো খাটে তার চোখ ভর্তি অশ্রু এসে যায় কোনো রকমে বলে আমাকে ছমাস সময় দিন  আমার এম এ পরীক্ষা টা হয়ে যাক তারমধ্যে আমি যেকোনো একটা চাকরি জোগাড় করে চলে যাবো। 
স্বামী অনিমেষ মানুষটা খুব ভদ্র এবং অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ সে তাড়াতাড়ি বলে তোমার সব দায়িত্ব আমার, তোমার কোনো অসুবিধা হবেনা,  শুধু স্বামী- স্ত্রী সম্পর্ক টা থেকে দূরে থাকবে সেদিন সে বলে আসলে আমি আর একজনের কাছে দায়বদ্ধ। 
নবমিতা অত্যন্ত অপমানিত হয়ে বললো এতো শিক্ষিত হয়ে আপনি শুধু বাবামায়ের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট করলেন? 
অনিমেষ তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরতে চাইলে সে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলেছিল দয়া করে আর অপমান করবেন না এমনিতেই আমি যথেষ্ট অপমানিত বোধ করছি। অনিমেষ বলেছিল সত্যি আমি খুবই দুঃখিত হয়তো একসাথে থাকতে থাকতে সময় সবকিছু ঠিক করে দেবে - 
কি ঠিক করবে সময়?  আজকের রাতটা একটা মেয়ের জীবনে কতোটা মূল্যবান আপনি জানেন না?  এই রাতটা কি আর ফিরে  আসবে?  তাছাড়া আমি একটু দূরে চাকরি নেবার চেষ্টা করবো যাতে সবার থেকে সরে গিয়ে একা নিজের মতন করে থাকতে পারি। 
নবমিতা দেখলো অনিমেষের দুচোখে একটা দুঃখ ভরা মমতা। নবমিতা একটা বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। কান্নার দমকে তার শরীরটা ফুলে ফুলে  উঠছিলো। সে অনিমেষ কে একথাও জানিয়ে দিয়েছে  যে অনিমেষের কোনো দয়ার দান চায়না নিজের খরচ সে নিজেই চালিয়ে নিতে পারবে। 
বিয়ের পরেরদিন একটা সাধারণ গোলাপি তাঁতের শাড়ি পড়ে তার মায়ের দেওয়া অল্প কিছু গহনা পরে ঘরের বাইরে এলো। বাইরে এসে দেখলো তার স্বামী অনিমেষ ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে নবমিতা একটু অস্বস্তিতে পরে সেও জিজ্ঞাসু মুখে স্বামীর দিকে তাকালো নবমিতাকে বললো, এক মিনিট একটু দাঁড়াও আমি এখুনি আসছি। নবমিতা অবাক হয়ে ভাবলো আবার কি তাকে অপমানিত হতে হবে না কি!  কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখলো তার স্বামী একটা ক্যামেরা নিয়ে এসে বললো, তুমি খুব সুন্দর দেখতে কাল রাতে এতোটা বুঝতে পারিনি সাধারণ সাজ পোশাকে তোমাকে খুব মিষ্টি লাগছে। আমি ছবি তুলতে খুব ভালোবাসি তোমার একটা ছবি নেবো। বিস্মিত নবমিতা আরও অবাক হয়ে গেলো তার মনে পড়লো সত্যি কাল রাতে অনিমেষ তার মুখের দিকে ভালো করে তাকায়নি তাই সে হাত দিয়ে স্বামী কে থামিয়ে দিয়ে বললো একটা সম্পর্কহীন মানুষের ছবি তুলে তাকে আর অসম্মানিত করবেন না প্লিজ। 
অনিমেষ বুঝতে পারলো নবমিতার প্রচণ্ড আত্মসম্মান বোধ। নিজের কাছে নিজেই ছোটো হয়ে গেলো। 
নবমিতা একটা বাক্স নিয়ে শাশুড়ি মায়ের ঘরে দাঁড়িয়ে বললো, মা আসবো?  হ্যাঁ  হ্যাঁ নিশ্চয়ই এসো। শাশুড়ি বিভা দেবী  লক্ষ্য করলেন তার চোখ মুখ অত্যন্ত ফোলা আর খুব শুকনো তবুও তার রূপের মাধুর্যে তিনিও বলে ওঠলেন বাহ্ সকালে এই সাধারণ সাজে তোকে কি সুন্দর লাগছে রে!  কিন্তু চোখ মুখ এতো শুকনো কেনো?  নবমিতার চোখ দুটো জলে ভর্তি হয়ে উঠেছিল সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, মা এই গয়নাগুলো তোমার কাছেই রেখে দাও, এতো জিনিস আমি কোথায় হারিয়ে ফেলবো। বিভাদেবী যেনো কিছু বুঝতে পারলেন ওর থুতনি ধরে আদর করে বললেন এসব আমি তোকেই দিয়েছি রে মা আর  তোর ননদরা এবাড়ির আত্মীয় স্বজনরা সব তোকে ভালোবেসেই দিয়েছে তুই আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছিস?  না মা ফিরিয়ে দিইনি আমি খুব অগোছালো তাই যদি হারিয়ে ফেলি তাই তোমার কাছে দিলাম আর তাছাড়া ---
তাছাড়া?  
এসবের যোগ্যতাও হয়তো আমার নেই। এই বলে সে ঘরের বাইরে যেতে গিয়ে দেখলো অনিমেষ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেলে অনিমেষ তাকে বললো, একটা কথা বলবো শুনবে? 
নবমিতা বললো, যা বলার বলে দিয়েছেন তো আর তো কিছু বলার নেই । অনিমেষ বললো আছে, অনেক কিছু বলার আছে সব একরাতের মধ্যে বলা সম্ভব হয় না। 
নবমিতা ওখান থেকে সরে এলো কারণ তার তখন কান্নায় গলা বুজে এসেছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে শাশুড়ির কাছে গিয়ে বললো, আমি কি চা করবো?  বিভাদেবী তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন আরে অষ্টমঙ্গলা টা যাক তারপর রান্নাঘরে ঢুকিস। কাল থেকে তো ভালো করে খাস নি, বল কি জলখাবার খাবি?  তাঁর শ্বশুর মশাই  অলকেশ বাবু বললেন আজ থেকে আমাদের মা এসে গেছে, মা যা মেনু ঠিক করবে তাই হবে। 
নবমিতা মুখ নামিয়ে নিয়ে বললো,  না না আমি কেনো? যা হবে তাই খাবো। একটু পরে কাজের মাসি আরতিদি ট্রে তে করে সবার জন্য চা বিস্কুট সাজিয়ে নিয়ে এলো। তার ননদরা আজ অবধি আছে সন্ধ্যা বেলায় সবাই চলে যাবে। প্রথমদিন মনে আছে ঢালাও লুচি তরকারি হলো আর ননদদের আবদারে অনিমেষ গরম বোঁদে নিয়ে এলো। 
এইভাবেই জীবন আরম্ভ হলো। তার কলেজ যাওয়ার সময় অনিমেষ তাকে গাড়ি করে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিল সে ভিষণ ভাবে আপত্তি জানিয়ে বলেছিল আমি নিজেই যেতে পারবো। এখন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে প্রিয় বন্ধু নিবেদিতা তাকে দুটো টিউশন জোগাড় করে দিয়েছিল, সে টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফেরে। তাছাড়া গান তার প্রাণের জিনিস গানেও সে ডিপ্লোমা প্রাপ্ত তাছাড়া বহু নামকরা শিল্পীদের কাছে গান শিখতো, তাই দুটো গানের স্কুলেও চাকরি নিয়েছিল। শ্বশুর বাড়িতেও সকালে উঠে সকালের চা সবার জন্য জলখাবার বানিয়ে তারপর ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি হত। রাত জেগে পড়াশোনা করতো। এরমধ্যে লক্ষ্য করেছে তার স্বামীর অনেক পরিবর্তন। ক্রমশ যেনো তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। 
একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে আর নবমিতার টিউশন পড়িয়ে  আসতে বেশ দেরি। বাসে খুব ভীড় তাই দু চারটে বাস ছেড়ে দিয়ে তবে অনেকক্ষণ পরে একটা বাস পায়। সত্যি কথা নবমিতার বাবার গাড়ি ছিল তার বাসে চড়ার অভ্যাস খুব একটা নেই তবু পরিস্থিতি মানুষকে সব অভ্যেসেই অভ্যস্ত করে তোলে। সেদিন তার বাস থেকে নেমে দেখে অনিমেষ অত্যন্ত উত্কণ্ঠা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে নামতে দেখেই তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে ছাতার তলায় নিয়ে এসে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে গাড়িতে ওঠায়। বাসস্ট্যান্ড থেকেও তার শ্বশুর বাড়িটা আরও কিছুটা দূরে। নবমিতা গাড়িতে বসে বললো আমার জন্য এতো কষ্ট করার দরকার ছিলোনা। অনিমেষ ওর দিকে একটা তোয়ালে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, বেশি কথা না বলে মাথাটা ভালো করে মুছে নাও একদম ভিজে গেছো তো কাল আবার জ্বর না এসে যায় । 
অনিমেষের এই চিন্তা বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে নবমিতা।  তাদের ঘরের লাগোয়া একটা ছোটো ঘর আছে, নবমিতা সেখানেই তার নিজের থাকার জায়গা করে নিয়েছে। রাত জেগে সে পড়ে বলে অনিমেষ প্রায় রোজই তাকে গরম কফি করে এনে দেয় আর নিজেও এককাপ খায় কারণ সেও রাত জেগে তার রিসার্চের কাজ করে। একএকদিন নবমিতাও দুজনের জন্য কফি করে নিয়ে আসে। গত দুদিন ধরে দেখছে তাকে জোর করে তার পড়ার টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে বসে কফি খেতে অনুরোধ করছে। সে বাপেরবড়ি গিয়ে দুদিন থাকতে না থাকতেই অনিমেষ গিয়ে উপস্থিত হয় আর তাকে নিয়ে আসে। নবমিতার মা মনে মনে হাসে আর বলে খুব বর সোহাগি দেখছি, মোটে ছেড়ে থাকতে পারেনা। নবমিতাও তার বাপেরবড়িতে তার জীবনের কথা গোপন রেখেছে। 
আজ সকালে সে চান করে এসে দেখে তার ছোটো ঘরের টেবিল আর ড্রেসিং টেবিলের ওপর অনিমেষ খুব সুন্দর ফুলদানিতে ফুল সাজিয়ে দিয়ে বলেছিল, ' হ্যাপি ভেলেনটাইনস ডে। 
আজ কলেজ থেকে বেরিয়ে দেখে অনিমেষ গাড়ি নিয়ে তার ইউনিভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, সে তো অবাক!  বন্ধু রা সব হেসে বলছে দেখ আজকের দিনে তোরা বর সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছে। নবমিতার লজ্জাও করলো আবার রাগও হলো কি দরকার এসব আদিখ্যেতার সত্যি টা তো আর এতে বদলে যাবেনা। সে গাড়ির কাছে এসে বললো, ' এ কি আপনি '!
হ্যাঁ আমি আজকের দিনে চলে এলাম আমার জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট মানুষটাকে কিছু বলার জন্য। 
অনিমেষ গাড়ি চালিয়ে দিলো সোজা চলে গেলো বাসন্তি হাইওয়ে ধরে। নবমিতা আশ্চর্য হয়ে বললো আমরা কোথায় যাচ্ছি? 
অনিমেষ মুচকি হেসে উত্তর দিলো চলোই না ঠিক দেখতে পাবে। একটা সুন্দর রিসোর্টের কাছে এসে তাদের গাড়ি থামলো। অনিমেষ তার হাত ধরে নামিয়ে বললো, এসো - 
নবমিতা আরও অবাক হয়ে বললো, এখানে?  
আরে এসোই না --। 
নবমিতা পায়ে পায়ে স্বামীর পেছন পেছন গেলো অনিমেষ রিসেপশনের কাছে গিয়ে বলতেই, রিসেপশনিস্ট বললো, হ্যাঁ স্যার  আপনাদের ঘর রেডি আছে। 
ঘরে ঢুকে  অনেমেষ দুকাপ কফি আর কিছু স্ন্যাকসের অর্ডার করলো। তারপর নবমিতার হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট দিয়ে বললো, এটা তোমার জন্য -- 
আমার জন্য ?  কেনো?  
খুলেই দেখোনা পছন্দ কি না? 
নবমিতা দেখলো একটা হালকা গোলাপি রঙের আগাগোড়া চিকনের কাজ করা খুব সুন্দর একটা শাড়ি । 
অনিমেষ ওর কাছে বসে ওর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো, পছন্দ? 
হ্যাঁ পছন্দ তো বটেই কিন্তু হঠাৎ আমার জন্য কেনো সেটাই বুঝতে পারছিনা? 
বুঝবে আসলে তুমি সব কিছুই একটু দেরিতে বোঝ বা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাওনা, 
মানে? 
মানে এইযে প্রথম রাতের কথাটাই ধরে রেখে দিয়েছো আর আমি যে তোমাকে এতোটা ভালোবেসে ফেলেছি সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইছোনা। 
নবমিতা সত্যি হাঁ করে বসে থাকলো, তার বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখদুটো জলে প্রায় ভরে এসেছে, অনিমেষ কাছে এসে দু'হাতের তালুতে তার মুখটা তুলে ধরে বললো, তোমার মতন এতো সুন্দর শান্ত স্নিগ্ধ একটা মেয়েকে ভালো না বেসে থাকা যায়?  তার কপালে এই প্রথম একটা ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিলো। নবমিতা দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো আর অনিমেষ তাকে দুই বাহু দিয়ে বুকের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো, কাঁদেনা, অনেক কেঁদেছো এবার থেকে আমরা শুধুই হাসবো কেমন?  আর তোমাকে কাঁদবার কোনো সুযোগ দেবোনা। এরপর দুজনে নিভৃতে এক অপরূপ ভালোবাসার মিলনে হারিয়ে গেলো। 
নবমিতা মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে বললো, তুমি খুব খুব বাজে,
অনিমেষ ওকে আরও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে বললো,  হ্যাঁ আমি সত্যি খুব বাজে কিন্তু আমি তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি।

Sunday, 12 February 2023

মনকলি ৪ র্থ পর্ব

মনকলি পর্ব ৪
পারমিতা চ্যাটার্জি 


পরের দিন মনকলির প্রথম জয়েনিং। মনে মনে ভিষণ টেনশন। যাই হোক সময় মতন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে চলে গেলো কলেজের দিকে। 
বলরামপুর কলেজে পৌঁছে প্রথমে তাকে টিচার্সদের কমন রুমে বসতে দেওয়া হয়, একজন ক্লার্ক নির্মল নামে তাকে বললো, এখানে বসুন আপনি ভাইসপ্রিন্সিপাল সাহেব এলে আপনাকে ডেকে নেবো। বসে থাকতে থাকতেই কলেজের লেকচারারদের সাথে পরিচয় হয়ে যায়।ওদের কাছেই জানতে পারে রাহুল স্যার মানে ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব খুব ভালো মানুষ। তাদের কালচারাল ফাংশনে উপস্থিত থাকেন এবং খুব উত্সাহ দিয়ে থাকেন। 
মনকলির মনে কেমন একটা খটকা লাগলো। যাইহোক দুরুদুরু বুকে ডাকের অপেক্ষায় বসে আছে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতো হলো না। একটু পরেই নির্মল বলে ছেলেটা এসে তাকে নিয়ে গিয়ে ভাইস প্রিন্সিপালের রুমের সামনে দিয়ে এসে বললো - যান, আপনাকে ডাকছেন স্যার। 
মনকলি ভেজানো দরজা খুলে মুখ নীচু করেই বললো, আসবো স্যার? 
- হ্যাঁ আসুন বলেই মুখ তুলেই চমকে উঠলেন রাহুল শাউ, তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, বসুন। 
আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দিন। 
মনকলিও কম ঘাবড়ে যায়নি, সে ও নিজেকে সামলে নিলো। অয়েন্টমেন্ট লেটারটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে যেনো একটু কেঁপে গেলো, রাহুল তার সেই কাঁপুনিটা লক্ষ্য করলো কিন্তু মুখে কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিলো শুধু  তারপর নিজের সই সাবুদ যা কারার করে বললো নির্মল আপনাকে রুটিন দিয়ে দেবে। আজ প্রথম দিন ওই ক্লাসে পৌঁছে দেবে।
কাঁপা গলায় মনকলি বললো, আমার যে অনেক কথা ছিলো, 
আমার তো আর কারুর সাথে কোনো কথা নেই। এখানে নতুন কেউ এলে সবসময় একটা ওয়েলকাম সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়, হল ঘরে প্র্যাকটিস চলছে, আপনি ইচ্ছে করলে ওখানেও যেতে পারেন। আমাকে একটু বেরোতে হবে, দুতিনদিনের জন্য শান্তিনিকেতন যাচ্ছি আমার এক বন্ধুর কাছে। আশাকরি আপনার কোনো অসুবিধা হবেনা, বলে হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বললো কলেজটাকে আপন করে নিতে হবে, হ্যাঁ ভালোবেসে পড়াতে হবে দেখবেন সবাই আপনাকে ও কতো আপন করে নেবে। লাল মাটির মানুষরা বড়ো সরল আর সাদাসিধা হয়।বলেই ফোনে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন, মনকলি বেরিয়ে আসার সময় শুনতে পেলো বউয়াদা বলছে, সুচরিতা, আমি বউয়াদা বলছি, আজই পৌঁছে যাচ্ছি শান্তিনিকেতনে আর রাতের খাবারটা তোমার কাছেই  খাবো। 
আরও কথা বলে যাচ্ছে, ওপাশ থেকেও হয়তো উত্তর আসছে। মনকলি একদম ভেঙে পড়লো, মনে মনে বললো, তুমি এভাবে আমাকে ভুলে গেলে!  এতো দূরে সরিয়ে দিলে, আমার কথাটা শুনলেও না একবার। 
সত্যি বউয়ার কোনো আবেগ এলোনা, এতোদিন পরে তার প্রথম জীবনের ভালোবাসাকে চোখের সামনে দেখেও। 
তবে কি সত্যি সেদিনের বউয়াদা আর আজকের রাহুলের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। না কি প্রতিশোধ নেবার প্রবল ইচ্ছা। নিজেকেই প্রশ্ন করে যাচ্ছে রাহুল। 
গাড়ি হু হু করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার  দু'ধারে  সবুজ গাছের সারি, তাল তমালের অরণ্য। তারই রাস্তায় লাল সিমূলে ভরা পাতাবিহীন গাছ, মাঝখানে পলাশ ফুলের  লাল রঙ  উঁকি  মারছে সবুজ পাতার মাঝে বসে। 
কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া দুলছে বসন্তের হাওয়ায়, রাহুলের মনটাও দোদুল্যমান এই ভরা বসন্তের আগমনে। সত্যি সে কাকে ভালোবাসে?  যে তাকে খুব বাজে ভাবে অপমান করে একদিন ফিরিয়ে দিয়ে উচ্ছল জীবনের  হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল। ফিরে তাকায়নি একবার ছোটবেলা থেকে একসাথে বড়ো হয়ে ওঠা একজনের মুখের কথা আর একজন সে ও বাল্য সখি নিস্তব্ধে নীরবে তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে, চেষ্টা করেও পারছেনা জীবনের দরজাটা অন্যকারও জন্য খুলে দিতে। 
হ্যাঁ তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যতা হয়তো   সন্ধ্যাবেলার নিভু নিভু দীপ শিখার মতন। কিম্তু ভালোবাসায় ভরপুর, সেই স্নিগ্ধ শান্ত সৌন্দর্য  তার চোখের আকুলতাকে বার বার ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উচ্ছল ঝর্ণার দিকে না এগোনই ভালো। যে ঝর্ণার পাথুরে আঘাতে তার মন একদিন ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।। 
তার এই ভাবনার  মাঝেই এসে গেলো বর্ধমান। 
একটু এগিয়ে  একটা মিষ্টি দোকানে বসে গরম সিঙারা কচুরি আর ল্যাংচা খেয়ে নিল। কিছু ল্যাংচা সুচরিতার জন্য কিনে নিলো। ভালোবাসার এই টানাপোড়েনে আজ সুচরিতার স্থান তার জীবনে সত্যি পাকা হয়ে গেছে। 
ক্রমশ 


Thursday, 9 February 2023

অসহায়

অসহায়
অনু গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জী 

কদিন অসুখে ভুগে বড় কাহিল হয়ে পড়েছে চৈতী, আজ তবু যেন একটু ভালো লাগছে।
কাজের মেয়ে রুমা এসে জোড় করে দুটো ভাত খাইয়ে গেল, এই খাওয়াটার ধকলে সে কাহিল হয়ে পড়েছে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে লেখার খাতাটা হাতে তুলে নিল।
একটু পড়ে তার স্বামী সুব্রত ঘরে ঢুকল, আজ কদিন পর সে বাড়ী ফিরল, চৈতীর অসুখের সময়টা সে বাইরে ছিল, বেড়াতে গিয়েছিল।
ঘরে ঢুকেই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, একটু খেতে পারলে? শরীরটা কেমন আজ? চৈতী এতো প্রশ্নের কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করলনা, সে পাল্টা প্রশ্ন করল, তারপর তোমার বেড়ানো কেমন হল? সুব্রত বলল আজকাল আর ভালো লাগেনা বুঝলে, এই সবাই এতো  করে ধরল, আর আমিও লোকের কথা ফেলতে পারিনা তো, যাক্ তুমি বিশ্রাম কর আমিও একটু শুয়েনি বুঝলে, কদিন বেশ ধকল গেল, সে একটা ফ্যান্সি ব্যাগ স্ত্রীর সামনে রেখে বলল, তোমার জন্য এনেছিলাম। চৈতী ব্যাগটা দেখে বলল, ভালো হয়েছে, না মানে তুমি এদিক ওদিক যাওতো তাই ভাবলাম...।
চৈতীর খুব হাসি পেল, অসুস্থ স্ত্রীকে ছেড়ে বেড়াতে যাবার অছিলা ঢাকতে কতরকম অজুহাত খারা করছে, পারেও মানুষটা, সুব্রত থাকল বা না থাকল তাতে যে সত্যি চৈতীর কিছু এসে যায়না একথা সুব্রত বুঝেও বুঝতে চয়না।
কদিন পর চৈতী সুস্থ হয়ে উঠেছে বেশ অনেকটা, আবার নিজের কাজের জায়গায় ফিরে এসেছে, আগামী কাল এন জি ওর একটা কাজে সুন্দরবন যাবার সব ব্যাবস্থা হয়েছে, ক জন মিলে তারা যাবে, একটা গাড়ী বুক হয়েছে।
বিকেলে সুব্রত ফিরল, অফিস থেকে বেশ শরীর খারাপ নিয়ে, চৈতী ডাক্তার ডাকল, অসুধ পত্র সব আনিয়ে দিল, তারপর সুব্রতর কাছে জানতে চাইল, কাল কি আমি যাব? সুব্রত বলল হ্যাঁ হ্যাঁ যাও, রুমাকে একটু শুধু সব বুঝিয়ে দিয়ে যাও,   চৈতী বলল,  হ্যাঁ আমি সব ব্যাবস্থা করে যাব।
পরদিন সব গুছিয়ে নিজে তৈরী হয়ে চৈতী সুব্রতর কাছে এসে দাঁড়াল, এই দেখ তোমার প্রেসক্রিপসন রয়েছে সামনেই রাখলাম অসুধগুলো সব নিয়ম করে খেও, যা খেতে ইচ্ছে করবে রুমাকে বোল করে দেবে, আর বিকেলে আবার ডাক্তার আসবে, যা অসুবিধে সব ঠিক করে জানিও।
চৈতী দেখল সুব্রত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, চৈতী কাছে এসে বলল, আমি আসছি তাহলে, সুব্রত হঠাৎ  বলে উঠল তুমি সত্যি যাচ্ছ?
হ্যাঁ তুমি তো বললে, তাছারা বেশী শরীর খারাপ হলে ডাক্তারকে ফোন করে দিও, তাছাড়া তোমার তো ক্লাবের লোকজন অনেক আছে, ওদের না হয় কাউকে ডেকে নিও,  সবাই নিজের কাজে ব্যাস্ত,  কেউ আসবেনা, আসবে আসবে,  ঠিক আসবে তুমি সব সময় ওদের কথা চিন্তা কর আর ওরা আসবেনা, তা কি হয়? সুব্রত করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, পৃথিবীতে কেউ কারো নয়, চৈতী বলল, ঠিক আসবে যাদের জন্য সব সময় দৌড়ে বেড়াও তারা আসবেনা তা কি করে হয়? আমার সাথে আর কতটুকু থাক, আমি আসছি।
চৈতী চলে গেল, আজ সুব্রতর প্রথম মনে হল চৈতীকে সত্যি হারিয়ে ফেলেছে, কর্তব্যের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখত তাই বুঝতে পারেনি, আজ সেই আড়ালটুকু ভেঙে দিল, তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল,  প্রথম নিজেকে খুব অসহায় লাগল।

Tuesday, 7 February 2023

মনকলি ৩য় পর্ব।

মনকলি তৃতীয় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি 


পুরুলিয়ার রুখু মাটির লাল রাঙামাটির পথের সাথে একাত্ম হয়ে গেছেন অধ্যাপক রাহুল শাউ। 
আগে নাম ছিলো রাজকুমার, এখন নিজের নাম নিজেই এভিডেভিড করে রেখেছেন রাহুল। 
রাজকুমার নামটা তার কোনদিনই পছন্দের ছিলোনা, তার মা তাঁকে ডাকতেন রাহুল বলে, সেই নামটাই এখন ব্যবহার করেন। 
আজ ছুটির দিন তাই বেড়াতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা পাহাড়ে, পাহাড়ের সৌন্দর্য, লাল পলাশের বন,রাঙামাটির পথ আর অজস্র নাম না জানা পাখির ডাক, গাছগাছালির মধ্যেই যত্নে রেখে দেন তার নিজস্ব এক বেদনাকে। এ বেদনার কথা কেউ জানেনা,  এ বেদনা এক না পাওয়ার বেদনা, যা তার একান্ত নিজস্ব গোপন এক কুঠুরিতে সযত্নে রেখে দেন। 
কেউ বোঝেনা সদা হাস্যময় মানুষটির জীবনের অন্দরে গোপনে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে, শুধু যে না পাওয়ার বেদনা তা তো নয় তার সাথে আছে এক অকারণ নিষ্ঠুর অপমানের ঘা। এখনও যেনো পরিস্কার শুনতে পান সেই অহংকারী কণ্ঠ, " তুমি কি আমার যোগ্য নাকি যে আমাকে এই প্রস্তাব দিতে এসেছো "! শুধু প্রত্যাখ্যান হলে হয়তো এতোটা কষ্ট পেতেননা যদি না তার সাথে এই নিষ্ঠুর অপমান টা থাকতো। ভুলে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু ভুলতে পারলেন কই?
এসে পৌঁছোলেন নিজের বাগানঘেরা ছোটো বাড়টিতে। মনের মতন করে সাজানো বাসা, সামনে একফালি জমিতে ছোটো বাগান, গেটের দু'ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছ,  মাঝখান দিয়ে লালমাটির রাস্তা, রাস্তার দু'ধারে নানান ধরনের ফুলের গাছ বাগান আলো করে আছে। সবুজ ঘাসের জমিতে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী লাখুয়া সবজির বাগান  করেছে। সামনে ছোটো গোল বারান্দায় উঠে গেছে পাতাবাহারের ঝার। দুটো বেতের চেয়ার আর একটি বেতের টেবিল দিয়ে সাজানো কাঁচঘেরা চারচৌকা বারন্দা। বেতের চেয়ারে বসে তারা গুনতে গুনতে, ঝিঁঝি পোকার ডাক, জোনাকের আলো আর দূর পাহাড়ের গা থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণার ঝিরিঝিরি শব্দ শুনতে শুনতে রাতগুলো কেটে যায়। 
লাখুয়া বাবুকে আসতে দেখে একবাটি চিঁড়ে ভাজা আর গরম ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এসে হাজির করলো। 
মলিন হেসে বললেন অধ্যাপক রাহুল, ' তুই ঠিক জানতে পারিস না, আমি কখন ফিরলাম '?  
- হ বাবু জানতি পারি, বাহিরে তো কুছু খাবেকটো লাই, সেই কুন সকালে দুটো রুটি আর একটু সবজি খাইছো, খিদেক লাগেনি তুমার? 
- হ্যাঁ লাগে, খাই তো, খাই না কে বললো!  টোস্ট খাই, ডিম সিদ্ধ খাই, ফল খাই, আবার কি লাগে রে!  টকদইও তো খাই, একটা মানুষের আর কতো খাবার লাগে বল?  
সত্যি খুব পরিমিত আহার করেন রাহুল, জীবনধারণের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকই খান, লাখুযা জোরজার করে খাওয়ায় তাকে। আজ খুব অন্যমনস্ক লাগছে রাহুলকে, আজ বেশ কয়েকদিন পর সুচরিতা কে ফোন করেছিলেন, বড়ো ভালো মেয়েটি, সুচরিতা তাকে সত্যি ভালোবাসে, বাইরের চাকচিক্যের প্রতি ওর কোনো মন টানেনা, যা মনকলিকে টানতো। সুচরিতা একজন সত্যিকারের মানুষ চায়। আজ রাহুল একটু অভিমানের সুরেই বলেছিল, ' একটা ফোন করেও আমার খবর নাওনা, আমি না ফোন করলে তো কথাই হয়না ', 
একটু চুপচাপ হয়ে সুচরিতা উত্তর দিলো, যাকে ভালোবাসি সে যদি নিজেকে দাদা বলে দূরে সরিয়ে রাখে তাহলে কি কথা বলবো বলো!  আমি যে তোমাকে ভালোবাসি বউয়াদা, আর এই কথাটা আমার কাছে খুব সত্যি, তাই তোমাকে দাদা বললে ঠকানো হবে, নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা ছাড়া আর উপায় কি বলো! 
- তুমি সত্যি বলছো! তুমি আমায় ভালোবাসো?  কিন্তু কেনো,  আমি যে খুব সাধারণ মানের জীবনযাপনে অভ্যস্ত সুচরিতা, বাবার সম্পত্তি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি দাদাদের কাছে, বিদেশে পড়াবার সুযোগ পেয়েও যাইনি, এই রাঙামাটির দেশই যে আমার স্বর্গ, এতো সাধারণ জীবন যাপন করতে গিয়ে একসময় ক্লান্ত হয়ে যাবে। মাটি, পাহাড়, আর জঙ্গলের নির্জনতা তোমাকে অবসাদ গ্রস্ত করে তুলবে,
- না বউয়াদা তুমি সাধারণের মধ্যেও একজন অসাধারণ মানুষ, আমি সেই প্রকৃত মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি তোমার মধ্যে, যাক সে কথা একা আমার ভালোবাসায় তো হয়না, আমি জানি তোমার মন অন্য কোথাও বাঁধা আছে, সেও তোমাকে খুঁজছে, হয়তো পৌঁছে যাবে খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে, 
অবাক হয়ে বললো রাহুল, মানে তুমি কার কথা বলছো, যাকে মনে রেখে কোনদিন কাউকে ভালোবাসতে পারোনি, আমি তোমার মনকলির কথা বলছি, মনকলির ডিভোর্স হয়ে গেছে, আমার এখানে এসেছিল  ছ সাত মাস আগে তোমার খোঁজে, আমি বলেছিলাম তুমি পুরুলিয়ায় আছো জানি কিন্তু কোথায় আছো জানিনা, তখনও তুমি আমাকে ফোন কর নি তো তাই তোমার ঠিকানা আমি সত্যি জানতাম না। 
রাহুল একটু থেমে বলেছিল, সুচরিতা তোমাকে একটা কথা বলবো? 
- হ্যাঁ বলো না, 
- তোমাকে আমি বলে এসেছিলাম যে আমার মনে অন্য কেউ আছে, কিন্তু আজ তোমার কাছ থেকে এখানে চলে আসার পর মনে হচ্ছে, তোমার চেয়ে আপন আমার আর কেউ নেই, যে শুধু আমি মানুষটাকে চিনেছে বুঝেছে, 
- তুমি সত্যি বলছো বউয়াদা? 
- হ্যাঁ সুচরিতা আমি তোমাকে সত্যি কথাই বলছি। হ্যাঁ ভালো কথা শোন, এখানে বলরামপুরের একটা কালচারাল ক্লাব আছে, আর কালচারাল ক্লাব মানেই তো আমি, তুমি জানো সেটা? 
- হ্যাঁ এও জানি তোমার সাথে আর একজনও থাকতো কিন্তু, 
- থাকতোওওওও, এখন সেটা অতীত হয়ে গেছে, আমরা বর্তমান নিয়েই ভাবি, আজ এখন আমার সাথে যে আছে তার কথাই ভাবা যাক, তুমি গাইবে সুচরিতা? 
- তুমি বললে আমি না করতে পারিনা বউয়াদা, তুমি জানো সেটা, কিন্তু মুসকিল হচ্ছে পুরুলিয়া অবধি না হয় আমি চলে গেলাম তারপর স্টেশন থেকে আমাকে নিয়ে আসতে হবে,  
- আরে নিশ্চয়ই, আমি তো ভাবছিলাম পরশু আমার দুটোর পর কোনো ক্লাস নেই ফ্রি আছি, তুমি যদি ফ্রি থাকো জানিও আমাকে তাহলে আমি একদিনের জন্য শান্তিনিকেতনে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবো, অনেকদিন যাই নি কবিগুরুর দেশে মনটা টানছে খুব একবার যাবার জন্য, তুমি আসবে তো সুচরিতা আমার সাথে কদিনের জন্য? 
- হ্যাঁ যাবো তবে কদিন ছুটি পাবো সেটা একটু দেখে নিতে হবে, 
ঠিক আছে তাই হবে। 
ক্রমশ

Wednesday, 1 February 2023

মনকলি --২য় পর্ব

 মনকলি ২য় পর্ব

পারমিতা চ্যাটার্জি

বড়ো গল্প


মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 

মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 

মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  

মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 

- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 

তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 

- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 

মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবে, কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 

সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন চাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 

মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু চা খাওয়াবে? 

উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 

একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 

মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 

উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 

- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 

- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 

- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টা লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।

এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 

- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 

আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 

- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 

চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে,তার শেষ একটা ইচ্ছে জানাবার জন্য।  তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  

ক্রমশ

সাত পাকে বাঁধা

সাত পাকে বাঁধা
পারমিতা চ্যাটার্জী 

কবে যেন কোন এক গোধূলি লগনে
বাঁধা পড়েছিলাম তোমার সাথে
সাত পাকের বাঁধনে,
আজ সেই বাঁধন বেড়ীর বাঁধন হয়ে
আটকে আছে হাতে পায়ে বুকে।
তুমি জানোনা...
তুমি জানোনা এই বাঁধনের ব্যাথা,
প্রতিদিন যন্ত্রনার অশ্রু জমা হয়
বুকের অনন্ত গহীনে।
তবু আমি হাসি, তবু আমি মেনে নি
তোমার অধিকারবোধ ,
আর একটু একটু করে
মেরে ফেলি আমার  আমিকে।
 মন বারবার ভালোবাসার ঘায়ে
রক্তাত্ব হয়ে বেঁচে থাকে ঘরের বাঁধনে,
মরে যায় সব সত্বা, হারিয়ে যায়
নীল আকাশের পাখীর গান,
বসন্ত আসা যাওয়া করে মনের
অলি গলিতে,
বিফলতার আবীরে রঙীন মুখের ছবি
ঢেকে  দেয় হৃদয়ের বেরঙা আব্রুকে,
আমরা বেঁচে থাকি রঙহীন কুয়াশার অন্তরালে।
তবু ঘর খুজি,
তবু বাসা বাঁধি,
এক স্বপ্নময় ভালোবাসার বাসা।
হায় গো মেয়ে...
বার বার শুধু কেন কাঁদাও অন্তরকে,
ভালোবাসা সে কি তোমার?
কখনো পিতার, কখনো পতির কখনো পুত্রের,
পরাধীনতার অপমান গ্লানিতে ভরা থাকে জীবনের প্রথম লগনে বাঁধা ঘর খানি।
তুমি ভাব আমি তোমার,
আমি এক অস্তিত্বহীন জরবস্তু,
মনহীন এক সত্বা,
সাতপাকের বাঁধনে বাঁধা
তোমার অধিকার বোধের
একটি সচল বস্তু মাত্র।

Monday, 30 January 2023

প্রেম এসেছিল

Paromita creationপ্রেম এসেছিল
পারমিতা চ্যাটার্জি 

যে প্রেম এসেছিল সেদিন,
সে প্রেম তো তোমার নয়,
তবে কেন অন্ধকারে হাতড়ে  বেড়াও তাকে?
সেদিন আকাশে ছিলনা চাঁদের আলো,
ঘন মেঘের কালো ছায়ায় ঢাকা
নিবিড় তিমির আকাশটা 
হেসে উঠেছিল ব্যাঙ্গের হাসি।
বোঝনি তুমি সেই ছলনা,
উচ্ছলিত উদ্‌বেলিত ঝর্ণার মতোন তোমার প্রেম
বয়ে চলছিল পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেতে খতে,
ডুবন্ত মনটা খুঁজে ফিরছিল
একফালি সবুজ মাটি,
তুমি পারোনি দিতে।
 
   আজ দেখো   আকাশে কত তারার মালা,
গাছ ঢাকা দিঘির জলে কাঁপছে পূর্ণিমার চাঁদের ছায়া,
তুমি চাইছো আসতে কাছে,
দুহাত দিয়েছ বাড়িয়ে,
চাঁদ তবু এলোনা কাছে
শূণ্য বাতায়নের রুদ্ধ কবাট
গেলোনা খুলে তোমার আওহ্বানে।

Saturday, 28 January 2023

পারমিতা ক্রিয়েশনস

মনকলি ২য় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প

মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 
মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে? 
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  
ক্রমশ

মনকলি --২ য় পর্ব

Paromita creationমনকলি ২য় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প

মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 
মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে? 
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  
ক্রমশ

Friday, 27 January 2023

অন্য শ্রাবণ

পারমিতা চ্যাটার্জী

শ্রাবণের শুরু হতেই মনটা কিছু পাওয়ার নেশায় মেতে ওঠে, কখনও বা হারাই হারাই হয়-- কি যেন হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের বৃষ্টি ভেজা প্রাঙ্গন থেকে।
প্রতি শ্রাবণই নিয়ে আসে নতুন ভেজা ফুলের গন্ধ --
শ্রাবণ শেষে সে গন্ধটাও মিলিয়ে যায়--
জীবন থেকে এক একটা শ্রাবণ হারিয়ে যাচ্ছে -- কোথায় কোনখানে?  কে তার খবর রাখে--।
মনকে বলি -- মন মেনে নাও এই হারিয়ে যাওয়া -- হারিয়ে তো যাবেই জীবন তাকিয়ে থাকবে আবার আগামী শ্রাবণের দিকে -- কি খবর নিয়ে আসে সেই অপেক্ষায় --।
তিথি কলেজ থেকে ফিরে একমনে বৃষ্টি দেখছিল-- এই শ্রাবণের বৃষ্টিতেই সে জীবনের অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছিল আবার পেয়েওছিল অনেক কিছু--- শ্রাবণের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় সে হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে অনুপমের কাছে-- দুজনে একই কলেজে পড়ত--- অনুপম তার থেকে দুবছরের সিনিয়র ছিল-- সে ছিল বিজ্ঞানের ছাত্র,  আর তিথি ছিল একবারেই বিপরীত মেরুর ছাত্রী -- দর্শন নিয়ে সে এম এ পাশ করেছে--- তাও কি করে যে দুজনে দুজনের প্রেমে পরে গিয়েছিল তা আজ আর মনে পরেনা--। হারিয়ে যে কেন গিয়েছিল কি এক অমোঘ টানে, আজ তিরিশ বছর পরেও তা মনের ক্যানভাসে ছবি হয়ে জেগে ওঠে একটি হারিয়ে যাওয়া শ্রাবণ সন্ধ্যা। 
ঘটনার পরের দিনই অনুপম তাকে নিয়ে গিয়ে কালি মন্দিরে  বিয়ে করে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল --। পরের দিন বাড়ী চলে গিয়েছিল-- ওর বাবা কৃষ্ণনগরে থাকত--  ওখানকার খুব নাম করা উকিল ছিল-- তাছাড়া ওখানে ওদের অনেক জমিজমা ও ছিল-- এককথায় বলতে গেলে খুবই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে-- ও কলকাতায় মেসে থেকে পড়াশোনা করত। আর তিথির বাবা ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ অফিসার-- মাও একজন নামকরা স্কুলের টিচার। -- ওদের পরিবার মানে বাবা মা দুজনেই খুবই আধুনিক মনষ্কের মানুষ ছিলেন।
তারপর দিন থেকে আর অনুপমকে দেখতে পায়নি --। অনেকদিন পর তাদের এক কলেজের বন্ধুর হাত দিয়ে অনুপম একটা চিঠি পাঠিয়েছিল-- তাতে লেখা ছিল বাড়ী এসে দেখে মা তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন সামনের মাসেই বিয়ে-- তাদের সব কথা শুনে বললেন এ বিয়ে না করলে মায়ের মরা মুখ দেখতে হবে-- প্রথম চারদিন মাকে একফোঁটা জল ও খাওয়ানো যায়নি-- বাধ্য হয়ে সে বিয়েতে মত দেয়-- তারপর মা উঠে জল খান--।
আমার কিছু করার ছিলনা-- কিন্তু এই বেড়া একদিন আমি ভেঙে ঠিক তোমার কাছে পৌঁছে যাবো --। সে আজ তিরিশ বছর আগের কথা--। তারপর থেকে জীবনের এক একটা শ্রাবণ চলে যাচ্ছে অনুপম আর আসেনি--।
তিথির বাবা মাই সব দায়িত্ব নিয়ে মানুষ করেন শায়ন কে -- তার আর অনুপমের সন্তান -- অনুপম শায়নের অস্তিত্বের কথা জানেও না, তিথি ও আর জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি।

অনুপমের কথা--
তিথি আমি জানি তোমার কাছে আমি এখন জগতের সবচেয়ে ঘৃণ্য মানুষ কিন্তু আমি যে কতখানি নিরুপায় ছিলাম তা একমাত্র ভগবানই জানেন-- চারদিন ধরে নিজের মাকে একফোঁটা জল না খেয়ে দেখেও আমি অবিচল ছিলাম কিন্তু যখন দেখলাম মায়ের প্রেসার ফল করছে, বাবা এসে বললেন -- মাকে না মেরে কি শান্তি হচ্ছেনা?  বাধ্য হলাম তখন নিজের ভালোবাসাকে বলি দিতে।
আমি আমার মনের কথা কাউকে বোঝাতে পারিনি-- তুমিও হয়তো বুঝবেনা -- তাই আমার চিঠির কোন উত্তর পাইনি--। জানিনা তুমি কোথায় আছ,  কেমন আছ?
প্রাণহীন ভালোবাসা হীন একটা সংসার জালে আবদ্ধ থাকা যে কি যন্ত্রণার তা কেউ বুঝবেনা--।
কিন্তু আজ এতদিন পর তোমার কথাই বসে ভাবছি তুমি জানতেও পারবেনা-- আমার শুধু মনে হয় ভেঙে গেছে আমার শ্রাবণের ভালোবাসা -- ভেঙে ফেলেছি প্রতিশ্রুতি, শ্রাবণ সন্ধ্যায় বিবাহের অঙ্গীকার -- তোমার কাছে যাবার মতন মুখ আর নেই -- কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবো তোমার কাছে? আমার চোখে এখনও তুমি সেই লম্বা বিনুনি বাঁধা চন্চলা তরুণী -- নাই বা দেখলাম তোমার বার্দ্ধক্যর ছবি--। একটা কথা স্বীকার না করে পারছিনা আমার  স্ত্রী শ্রুতি বড় ভালো আর সরল মেয়ে -- তোমার কথা ওকে আমি সব বলেছিলাম -- ও সব নিঃশব্দে মেনে নিয়ে আমায় ভালোবেসেছে-- আমায় অনেক বার বলেছে তোমার খোঁজ করতে,  আমিও খুজে ছিলাম, পাইনি তোমায় আর--। 
শ্রুতিকে  দুবছর ছুঁই নি -- কিন্তু ওর সহ্যশক্তি মায়া মমতা, গোপন অশ্রু সব আমায় ভুলিয়ে দিল-- কখন যেন নিজের অজান্তেই ওর কথা ভাবতে শুরু  করলাম--- ভাবছো তো? কি অমানুষ আমি? কিন্তু তিথি তুমিই বল-- ওর তো কোন দোষ ছিলনা-- তবুও নিজের অধিকার নিয়ে কখনও আমায় বিব্রত করে তোলেনি-- নিঃশব্দে সব মানতে মানতে একদিন কঠিন নার্ভের অসুখের শিকার হয়-- দুটো মেয়ের জীবন আমার জন্য নষ্ট হচ্ছে?  নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করি-- আমি কি? আমি কি মানুষ?  সেদিনের শ্রাবণ সন্ধ্যার বৃষ্টিভেজা স্মৃতি না হয় মিথ্যা হয়ে যাক একজনকে অন্তত ভালো ভাবে বাঁচতে সাহায্য করি-- এরপরই দুঃখী নিরপরাধ মেয়েটাকে কাছে টেনে নিয়ে তাকে স্ত্রীর সম্মান দি-- ভালো হয়তো বাসতে পারিনি--- কিন্তু তার প্রতি মায়া মমতা, স্নেহর আমার কোন অভাব ছিলনা-- আমাদের একটি কন্যা সন্তানও হয়--। 
শ্রুতিকেও বেশিদিন আমি ধরে রাখতে পারিনি-- দীর্ঘদিনের অযত্নে অবহেলায় ভেঙে পরা শরীর আর জোড়া লাগলো না -- শ্রুতি চলে গেলে আমায় ছেড়ে -- যেন এক চরম শাস্তি দিয়ে গেল-- যাওয়ার আগে আমায় বলে গিয়েছিল-- " আর তো কোন বাধা রইল না, এবার দিদিকে ভালো করে খুজে নিয়ে এসো--।
না সত্যি কথা বলতে আজ আর দ্বিধা করবনা তোমায়-- আমি শ্রুতির স্মৃতিকে মেরে ফেলতে চাইনি-- বরং খুব যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছি---।
শুধু এই শ্রাবণ সন্ধ্যা গুলোয় মনটা তোমার কাছে চলে যায়-- অপেক্ষায় থাকি এক শ্রাবণ চলে গেলে আর একটা শ্রাবণের--।

তিথি জানলা ধরে শ্রাবণের বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবছে এই শ্রাবণটাও চলে যাবে-- আসবেনা কেউ--।

নীরব অভিমান

Paromita creationনীরব অভিমানে
পারমিতা চ্যাটার্জী 

পায়ে পায়ে এসেছিলাম চলে অনেকটা দূরে,
মাঝপথে দেখা হয়েছিল তোমার সাথে,
তুমি ডাক দিয়েছিলে আমায়,
পথের মাঝে  বটগাছের ছায়ায়
আমরা নিয়েছিলাম ভালোবাসার আশ্রয়।
তারপর হাত ধরে এগিয়ে গেলাম
আরো অনেকটা পথ,
বসন্তের উন্মত্ত বাতাসে 
দুজনেই এলোমেলো,
চাঁদ ওঠা বনজোছনায়,
হাসনুহানার গন্ধে জড়িয়ে নিলাম
একে অপরকে এক গভীর অনুভূতির আবর্তে।
হঠাৎ পধের বাঁকটা ভাগ হয়ে গেল দুদিকে,
আমরা চললাম ভিন্ন পথে,
বটগাছের তলায় ভালোবাসার ছায়াটা
আজো দুলে যায়,
বনজোছনার আলো নীরবতার কোণে
উকি দিয়ে যায়,
জানিনা কি বলতে চায়,
শুধু নীরবতা চেয়ে থাকে
নীল আকাশের দিকে,
ভালোবাসার নীরব অভিমানে।।

Sunday, 22 January 2023

বঙ্গ মায়ের বীর সন্তান

 বঙ্গমায়ের বীর সন্তান 

পারমিতা চ্যাটার্জি 


পরাধীন ভারতমাতার শৃঙ্খল উন্মচনে যখন উদভ্রান্ত চরমপন্থী ভারতের বিপ্লবী দল,

যখন তাদের সামনে একটাই দিশা ভারতমাতার মাটিতে পুঁততে হবে স্বাধীন ভারতের পতাকা, 

তখনই ঠিক তখনই ভেসে এলো এক দৃপ্ত কণ্ঠস্বর 

" তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো "। 

কে সেই মহান নেতা যাঁর বজ্র গম্ভীর কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিলো,এখন এসেছে সময়, অস্ত্রের বদলে অস্ত্র ধরার, 

হ্যাঁ তিনিই আমাদের নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ভারত তথা বঙ্গমায়ের বীর সন্তান আমাদের ঘরের ছেলে সুভাষ চন্দ্র বসু। 

আপোষহীন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সমস্ত শক্তি নিয়ে,

 তরুণ বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করলেন মায়ের হাতের শৃঙ্খল উন্মোচনে। 

দূর্বিনীত স্বৈরাচারী ইংরাজ শাসক বারবার অক্ষম  হয়েছে তাঁকে দাবিয়ে দিতে, 

কারাবন্দী জীবনের যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে আবার নতুন উদ্যমে উন্নত শিরে এগিয়ে গিয়েছেন লক্ষ্য  পূরণে। 

চোখে শুধু একটাই স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে, চাই স্বাধীনতা, " মানবেনা ভারতবাসী আর বিদেশি শক্তির অপশাসন "। 

অপারগ ইংরেজ সরকার তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখলেন, 

বন্দী থাকার মানুষ তো তিনি নন,

ছদ্মবেশে শাসকের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেলেন কাবুল আফগানিস্তান পেরিয়ে সুদূর বার্লিনে, 

সবাই যখন জানে সুভাষ চন্দ্র নিরুদ্দেশ, 

চতুর্দিকে তাঁর খোঁজ চলছে, 

বিপ্লব কি তাহলে ঝিমিয়ে যাবে! 

ঠিক তখনই বার্লিনের রেডিও থেকে ভেসে এলো, 

সেই পরিচিত দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, " আমি সুভাষ বলছি"। 

জার্মান থেকে সাবমেরিনে জাপানে এসে পৌঁছে 

গড়ে তুললেন বন্দী ভারতীয়দের নিয়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তাঁর সৈন্যদল, আজাদ হিন্দ ফৌজ। 

প্রবল শীত, অন্ধকার পাহাড়ের পথ, খাদ্য নেই, নেই বস্ত্র, 

আছে শুধু তাদের নেতার দেখানো স্বাধীন দেশের 

স্বপ্নের অঞ্জন চোখে, 

তাই নিয়ে এগিয়ে চলেছে বীর সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজের বাহিনী। 

আসতে আসতে তারা প্রায় চলে আসে ইম্ফলে,

তুলে ধরেন স্বাধীন ভারতের পতাকা, 

প্রায় দেশ স্বাধীনের মুখে, হঠাৎ এলো সেই ভয়ংকর খবর, নেই!  

আমাদের ভারত মায়ের বীর সন্তান নেতাজি সুভাষ আর নেই, 

তাঁর নাকি মৃত্যু হয়েছে, প্লেন ক্র্যাশেব!

এ যে মিথ্যা, নিদারুণ মিথ্যা, 

কোথায় গেলেন সুভাষ!  জানা গেলো সেদিন কোনো প্লেন ক্র্যাশ হয়নি, 

তাহলে!  এই তাহলে প্রশ্নের উত্তর আজও ভারতবাসীর কাছে অজানা, 

আজও ভারতবাসী জানেনা, ভারতের স্বাধীনতা যাঁর জন্য এসেছিল সেই বীর সুভাষ আর কোনদিন ফিরে আসেন, 

উত্তর দিতে পারেন নি, তদানিন্তন ভারতের রাষ্ট্রীয় নেতারা, 

না কি উত্তর দিতে চাননি, এ প্রশ্ন এখনও প্রশ্নই থেকে গেছে, 

শুধু জানি আমাদের বঙ্গমায়ের বীর সন্তান আার ফিরে আসেন নি। 

ভারতবাসীর হৃদয়ে আজও তিনি উজ্জল, আজও ২৩শে জানুয়ারি এলেই আপনি প্যারেডের তালে তালে পা চলে, " কদম কদম বাড়ায়ে যা, খুশিকে গীত গায়ে যা, ইয়ে জিন্দেগী কি কৌম কি, তু কৌম পর লুটায়ে যা "।।

Saturday, 21 January 2023

প্রথম প্রেম

 


প্রথম প্রেম

অনুগল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 



এখনও মনের কোণায় পড়ে আছে ফেলে আসা পথের শেষ রেখা খানি। বিশ্বাস কর অমিতাভ এখনও তোমাকে খুঁজি  তোমাদের সেই চতুষ্কোণ তিনতলার বারন্দায়। যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে আমাকে দেখার জন্য। আমাদের স্কুল বাসটা ওখান থেকেই আমাকে তুলতে আসতো। আবার যখন ফিরতা তখনও দেখতাম নির্নিমেষ তুমি দাঁড়িয়ে আছো সেই বারন্দায়। আমার অজান্তেই চোখ দুটো চলে যেতো রাস্তা থেকে একফালি তিনতলার বারন্দায় যেখানে একটি ছেলে তার ভালোবাসার দৃষ্টি  মেলে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো। সেদিন বাড়ির ভয় যে কথা বলতে পারিনি তা আজ জীবনের শেষবেলায় এসে খুব বলতে ইচ্ছে করছে। তুমি  জানোনা যে আমি ঘুরেফিরে আবার আমার সেই ছোট্ট বেলার পাড়ায় এসে ঘর বেঁধেছি। জানিনা তুমি এখনও ও বাড়িতে আছো কি না বা কোথায় আছো?  কেমন আছো? 

তৃষ্ণার্ত চোখে তাই যাতায়াতের পথে বাড়িটার দিকে চেয়ে তোমাকে খুঁজি। হয়তো অনেক বদলে গেছো তাই চিনতে পারিনা। হয়তো তুমিও আমার মতন দাদু হয়ে গেছো। সবটাই হয়তোতেই আটকে আছে। 

দেখা হলে একবার তোমাকে বলে যেতাম যে আমিও ভালো বেসেছিলাম। তাইতো জীবন সায়াহ্নে এসে তোমায় খুঁজি তোমার জায়গায়। কিন্তু পাইনা। জানিনা আদৌ কোনদিন পাবো কি না!  যেখানেই থাকো খুব ভালো থেকো আর পারলে মনে করার চেষ্টা কোরো, বারন্দায় দাঁড়িয়ে স্কুল যাতায়াতের সময় একটি মেয়ের অপেক্ষায় থাকতে শুধু তাকে একবার দেখবে বলে। সেই মেয়েটিও এখন প্রায় বৃদ্ধাই বলা চলে তবুও তার অবুঝ মন খুঁজে চলে প্রথম যৌবনের অসম্পূর্ণ প্রেমকে। 

Friday, 20 January 2023

জীবন ও ভালোবাসা

 জীবন ও ভালোবাসা

পারমিতা চ্যাটার্জী 


বসন্ত তোর মিঠে রোদখানা বড়ই মায়াময়,

আনাগোনা করছে মেঘ বৃষ্টির আড়াল দিয়ে,

মনের আয়নায় হাল্কা মেঘের খেলা,

মনের রোদে শুকোয় ভোরের ভেজা চুল, 

ইতিউতি ছড়িয়ে পলাশের লাল ছিটে।

অষ্টাদশীর লাল শাড়ীর আঁচল কোমরে জড়িয়ে,

কোথায় যায় কোন বসন্তের সুখ কুড়িয়ে নিতে?

চঞ্চল  নদীর ঝিরঝিরে ধারা আছড়ে  পড়ে

মল পড়া রাঙা পায়ের তলায়,

সন্ধ্যার চাঁদ বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে,

মুখ লুকোয় মায়াবী জোৎস্নার আড়ালে,

বসন্ত যে বড়ই চঞ্চল, 

শুধু আসা যাওয়ার খেলা খেলে যায়

মনের আনাচে কানাচে।

উন্মত্ত দক্ষিণা বাতাসের তাণ্ডবে

ঝরে পড়ে কৃষ্ণচূড়া ফুল,

পাতাবাহার সযত্নে মেলে ধরে নিজকে

সবুজের আঙিনায়,

কালকের রঙ ধূসর হবে বলে

আজ কেন সবুজ লুকিয়ে যাবে?

কালকে অষ্টাদশী কাঁদবে বলে

প্রেমের জোয়ারে  মনকে কেন

 ভাসাবে না আজ?

কাল অমাবস্যার আঁধারে

আকাশ ঢাকবে বলে

বসন্ত পূূণিমায় চাঁদ 

কেন হাসবেনা?

দুঃখ বেদনার মাঝে

ভালোবাসা কেন উকি দেবেনা?

জীবন ও ভালোবাসা

জড়িয়ে আছে একে অন্যকে

গভীর চেতনার বন্ধনে

জীবন যতদিন আছে

ভালোবাসাও তার হাত

ধরে  নীরবে চলে যায়।।

Thursday, 19 January 2023

মোহর

 বিভাগ- গল্প

শিরোনাম - মোহর

 কলমে-পারমিতা চ্যাটার্জী 


মোহর বিদেশ থেকে শাশুড়ি মাকে ফোন করলো-

- কেমন আছো মা? 

- এই আছি মা, চলে যাচ্ছে 

- আমি জানি মা তোমার খুব একা লাগে তাইনা?  

- হ্যাঁ রে একাকীত্ব বড়ো কষ্টকর,  সব থেকেও যেনো কিছু নেই, মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে নিজেকে - 

- আর অসহায় লাগবেনা, আমার ওপর একটু ভরসা রাখো, আর সেই পুরানো সব সংস্কার থেকে তোমাকে আমি বের করে আনবোই। সব কর্তব্য তোমার হয়ে গেছে, এবার তোমাকে শুধু নিজের জন্য বাঁচতে হবে। 

- মা সামনের মাসে আমি আসছি তোমার কাছে, অনেকদিন তোমাকে দেখিনি, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, তুমি তো জানো সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, এখন মা বলতে তোমাকেই বুঝি। 

অন্নপূর্ণা দেবী জানেন এই মেয়েটি নামেই তার পুত্রবধূ, কিন্তু তার ভালোবাসা,কোন সন্তানের চেয়ে  কিছু কম নয়। 

তাঁর অন্তরের দুঃখ বেদনা, নিত্য স্বামীর অপমান সে নিজে চোখে দেখেছে, একমাত্র সেই রুখে দাঁড়িয়ে ছিল শ্বশুরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। 

আঙুল উঁচু করে বলেছিল, " আর যদি কোনদিন দেখি আপনি আমার মামনিকে কোন অপমান করেছেন, তবে জেনে রাখবেন সেদিন আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে "। 

আধুনিক মেয়ে মোহরের তীব্র চোখের দৃষ্টির সামনে সেদিন মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়েছিল সেই লোকটা, যার নাম ছিল প্রদ্যোত, আজ তিন বছর হল তাকে সে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু একথা সত্যি যে তার মৃত্যুতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি অন্নপূর্ণাদেবীর বরং একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তার। 

সারাজীবন শিক্ষিতা স্বনির্ভর অন্নপূর্ণাকে সে মানুষিক তো বটেই শারীরিক অত্যাচারও কম করেনি। রাতগুলো ছিল বিভীষিকা, রিতীমত ধর্ষিত হতেন তিনি স্বামীর হাতে প্রতিরাতে, একবার বড়োছেলেকে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিলেন, " তোরা তো বড়ো হয়েছিস তাই বলছি, প্রতিরাতে তোর বাবার এ অত্যাচার আর তো আমি সহ্য করতে পারছিনা, " মায়ের ঘাড়ে দগদগে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট তখনও, সে তাড়াতাড়ি মায়ের ক্ষত জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিল,তারপর মায়ের হাত ধরে বাপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এটা কি?  নির্লিপ্ত উত্তর দিয়েছিল নির্লজ্জ লোকটা, আমি কি করবো? ওরকম সব মেয়েদেরই হয়, 

ছেলে রুখে দাঁড়িয়ে আবার বলেছিল, না সবার হয়না,তোমার মতন পশুর সাথে যাদের ঘর করতে হয় তাদেরই হয় -

বাবার চিত্কারকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল একবার গলা তুলে দেখ, তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে দেব,আর আজ থেকে মা আলাদা শোবে, এই নিয়ে তুমি যদি কোন গণ্ডগোল কর তাহলে তোমাকে আমি টানতে টানতে পুলিশের কাছে নিয়ে যাব। চিতকার চেঁচামেচিতে অন্য দুই ছেলেও এসে গেছে ছোট ছেলে তো মায়ের আঘাত দেখে উত্তেজিত হয়ে বাবাকে মারতে উঠেছিল, অন্য ভাইয়েরা থামিয়ে দিয়ে বললো ছেড়ে দে। 

সেই থেকে তার শোবার ঘর আলাদা,  বউমারা এসেও দেখেছে শাশুড়ি মায়ের  আলাদা শোবার ব্যাবস্থা। শ্বশুরের মুখে কুশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুনে আলাদা থাকার কারণ টা তারা বুঝে নিয়েছিল। 

মোহর শাশুড়ি মায়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, তাকে অনেক মনের কথা বলেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। 

সেই সময় মোহরকে বলে ফেলেছিলেন তার একান্ত মনের গোপন কথাটি। 

কলেজে পড়বার সময় তাঁর খুব ভালো লাগতো তাঁদের প্রফেসর অমলেন্দু নাগকে, বোধহয় তাঁরও ভালো লেগেছিল  স্বল্পভাষী মিষ্টি অন্নপূর্ণাকে,

সবাই বলতো স্যার তো একজনের মুখের দিকে চেয়েই লেকচার দিয়ে যান, আর কোনদিকে তাকান না। লজ্জা পেতেন তিনি সহপাঠীদের কথায়, কিন্তু এ কথা সত্যি যে তিনি তার দিকে তাকিয়ে পড়িয়ে যান। কিন্তু কেউ কোনদিন মনের কথা কাউকে বলেন নি। কলেজ শেষ হবার পর মার্কশীট আনতে যেদিন অন্নপূর্ণা কলেজে গেলেন সেদিন তিনি নিজেই স্যারের সাথে দেখা করতে গেলেন, স্যারের ঘরে তখন নতুন ভর্তির জন্য বেশ কিছু লোকজন ছিল, তাকে দেখে তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে তিনি বাইরে এসে বলেন," আমি জানতাম তুমি আসবে ", 

অন্নপূর্ণা মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন লজ্জায়। তিনি ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, একটু বাইরে অপেক্ষা করতে পারবে?  আমি এই কাজটা সেরেই আসছি -

অন্নপূর্ণা মাথা নামিয়েই সম্মতিসূচক ঘাড়া নেড়ে বাইরে আসেন।  

একটু পরেই উনি বেরিয়ে এলেন, বললেন চল-

অন্নপূর্ণার ইচ্ছে থাকলেও জিজ্ঞেস করতে পারলেননা কোথায়!  নীরবে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। একটু পরেই একটা কফিশপে দুজনে বসলেন, তারপর উনি খুব ধীর স্থির গলায় বললেন, বহুদিন থেকেই একটা কথা তোমাকে বলতে চাইছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি, আজ তোমার কলেজ জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, আজ আর না বললে আর হয়তো বলাই হবেনা তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম-

- অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন - উনি বললেন, কলজে যখন তোমার মুখের দিকে চেয়ে পড়াতাম, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি আমাকে একটু অন্য ভাবে পছন্দ কর,মানে আমার প্রতি একটা ভালোলাগা তোমার মধ্যে কাজ করে- কি আমি ঠিক বলছি তো?

অন্নপূর্ণা তখন রীতিমতো ঘামতে শুরু করে দিয়েছেন, কোনরকমে মুখ নামিয়ে বললেন, হ্যাঁ -

- তিনি তখন বললেন - ব্যাস আমি এই উত্তর টার জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম, আচ্ছা!  তুমি কি বুঝতে পেরেছিলে যে আমিও তোমাকে খুব পছন্দ করি - 

অন্নপূর্ণা এবার একটু মুখ তুলে বলেছিলেন, আন্দাজ করেছিলাম, তাইতো আজ সাহসে ভর করে আপনার ঘরে এসেছিলাম, যদি কিছু বলেন তাই -

- তিনি হেসে ফেলে বললেন, যতোটা ভালোমেয়ে ভেবেছিলাম ততোটা মোটেই নয় তাহলে দেখছি, বলেই হেসে উঠেছিলেন আর অন্নপূর্ণাও ওর টোল ফেলা গাল নিয়ে হেসে ফেলেছিলেন। 

তারপর ওরা আরও দুচারদিন দেখা করেছিলেন, দুজনে মনের কাছাকাছি এসেছিলেন। 

প্রায় একমাস ঘোরাঘুরির পর একদিন গঙ্গার ধারে তার হাতটা ধরে বলেছিলেন, তুমিতো এম এ পাশ করে এমফিল করবে?  

- হ্যাঁ সেই রকমই তো ইচ্ছে আছে -

- ইচ্ছে আছে না করতেই হবে - আর তার সাথে আর একটা জিনিসও করতে হবে-

-কি? 

- অপেক্ষা - পারবেনা আমার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে?  আমি একটা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছি পোস্ট ডক্টরেটের জন্য, পাঁচটা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে,তুমি পারলে পি এইচ ডি আরম্ভ করে দিও, আমি নিয়মিত তোমাকে নোটস পাঠাবো, চিঠিও লিখবো, দেখবে ঠিক সময় কেটে যাবে - 

- তিনি বলেছিলেন করতেই হবে, এখন তো আর কোন রাস্তা নেই, ভালোবেসেছি যে-

- তিনি মৃদু হেসে সেদিন অন্নপূর্ণার মাথাটা বুকের কাছে টেনে এনে তার কপালে একটা আলতো চুম্বন দিয়ে বলেছিলেন, ভালোবাসার অপেক্ষা খুব মধুর হয়-। 

কিন্তু এমনই ভাগ্য যে এমফিল শেষ হবার সাথে সাথেই বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো,তারা ধনে প্রাণে শেষ প্রায় শেষ হয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে তাকে কলেজের চাকরি নিতে হল, পি এইচ ডি করা আর হল না। ভেবেছিলেন একটু সামলে নিয়ে পি এইচ ডি আরম্ভ করবেন। তাদের বসতবাড়িও বাধা পড়েছিল বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে, বাধ্য হয়ে তাদের তিন ভাই বোন বোন সমেত মাকে কাকার বাড়ি আশ্রয় নিতে হয়েছিল। 

তখন কলেজের মাইনে এতো বেশি ছিলোনা, তাই দুই ভাইবোনের পড়া আর টিউশনির খরচ দিয়ে কাকার হাতে খুব কম টাকাই দিতে পারতেন, এতে কাকা কাকীমার অসন্তোষ টের পাচ্ছিলেন, তখন একাধিক টিউশন নিয়ে সাংসারিক ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছিল, তাতেও শান্তি ছিলোনা। এরকম অবস্থায় একদিন হঠাৎ জানতে পারে কাকা তার বিয়ে ঠিক করেছে, মায়ের কান্না, তার অনেক অনুনয় বিষয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মূর্খ কিন্তু কিসব চামড়ার ব্যাবসা করে প্রদ্যোতের সাথে তার বিয়ে দিয়ে জীবনের চিত্রটাকে কাকা পুরো বদলে দিয়েছিল। অমলেন্দুকে সবই খুলে লিখেছিলেন তিনি তার অক্ষমতার কথা, অমলেন্দু চিঠিতে জানিয়েছিল আর একটু আগে কেন জানালেনা-?

আমি চলে আসতাম - 

- তিনি উত্তরে দিয়েছিলেন, মাত্র সাতদিন আগে তাকে জানানো হয়েছিল তার বিয়ের কথা, তখুনি চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে যখন চিঠি পৌছেছে তখন আমার যা হবার তা হয়ে গিয়েছে। 

একমাত্র মোহরকেই এসমস্ত কথা তিনি বলেছিলেন,  মোহর ছয়মাসের ছুটি নিয়ে এলো - অন্নপূর্ণা দেবী আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে, তুই এতোদিন থাকবি আমার কাছে- 

- হ্যাঁ মা জীবনে অনেক কষ্ট করেছ, আর নয় এবার তোমার একটা ব্যাবস্থা করবো বলেই এসেছি -

- কি ব্যবস্থা -?

- সেটা সারপ্রাইজ থাক-। 

মোহর অমলেন্দুর সাথে যোগাযোগ করে শহর থেকে একটু দূরে একটি বিরাট বাড়ি কেনা হয়েছিল, অমলেন্দুই কিনেছেন, মোহর বহুদিন থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করে এই ব্যবস্থা করেছিল, বাড়িটি হয়েছিল বৃদ্ধাশ্রম, শ্রীরামপরে একদম গঙ্গার বক্ষে বাড়িটি ছিল, সেখানে ডাক্তার, হোম কিচেন সব ছিল, একটা ঘরওলা ছোট ফ্ল্যাট আবার দুটো ঘরওলা ফ্ল্যাটও ছিল, বাড়ির সামনে ফুলের বাগান, পিছনে একটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন  সাজানো ঝিলকে ঘিরে সব্জির বাগান। অমলেন্দু তার নিজের জন্য দুই ঘরওলা একটা ফ্ল্যাট রেখেছিলেন, বাকি সব ফ্ল্যাট গুলোই ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে বড়ো বড়ো করে একটি শ্বেতপাথরের প্লেটের ওপর লেখা ছিল অন্নপূর্ণা বৃদ্ধাশ্রম। 

এসব কথা অন্নপূর্ণা কিছুই জানতেন না। 

কিছুদিন পর মোহর তাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বললো, চল আমার সাথে একটু বেরোতে হবে, 

কোথায় রে?

গেলেই দেখতে পাবে -। 

যাবার পথে মোহর গাড়ি থেকে নেমে কিসব কিনলো যেনো, তিনি দেখলেন দুটো বড়ো ফুলের গোড়ের মালা দু তিনটি বিরাট বাক্স ভর্তি করে মিষ্টি, 

- তোর মতলব টা কি বলতো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে? 

- উফ্ বড়ো কথা বল তুমি, চল তো চুপচাপ। 

এরপর তো আরও অবাক হবার পালা, একটি রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়ালেন দুজনে, দেখলেন অমলেন্দু বেরিয়ে এলেন ধুতি পান্জাবী পরে। পরের ঘটনা তো আর বলার দরকার নেই। 

সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের সবাই খুব আনন্দ করলো, অমলেন্দু সবার জন্য ছোট করে খাওয়ার আয়োজন করেছিলেন, তার সাথে মোহরের আনা মিষ্টি, মায়ের জন্য একটা সাদার ওপর লাল পার দেওয়া বেনারসি, আর অমলেন্দুর গরদের পান্জাবী আর ধুতি। ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললো এই নাও মেয়ের বাড়ি থেকে আনা ফুলশয্যার তত্ত্ব। 

অন্নপূর্ণা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললেন তুই পেটে পেটে এতো কিছু করেছিস, আমাকে কিছু জানতে দিস নি -

- আমি তো কিছু করিনি মা শুধু দুটো বহুদিন ধরে অপেক্ষাকৃত হৃদয়কে মিলিয়ে দিয়েছি, যা তোমার পাওনা ছিল আমি তাই করেছি শুধু এই বৃদ্ধাশ্রমে। 

কাকুর কাছে যখন শুনলাম কাকু তোমার নামে এই বৃদ্ধাশ্রম করেছেন আর তিনিও একা কাউকে বিয়ে করতে পারেননি শুধু তোমাকে ভালোবেসে ছিলেন বলে, আমি এই বৃদ্ধাশ্রমে দুটি ভালোবাসাকে এক করে দিলাম শুধু। 

রাত্রি এলো,অমলেন্দু পরিপূর্ণ ভাবে তাকালেন তার যৌবনের ভালোবাসায় দিকে-তারপর দুহাত বাড়িয়ে দিলেন, 

অন্নপূর্ণা ধরা দিল সেই বহু প্রতিক্ষিত বাহুবন্ধনে। 

এতদিনের অপূর্ণ ভালোবাসা মুক্তি পেল অবশেষে বৃদ্ধাশ্রমের একটি স্বল্প পরিসর ফ্ল্যাটে।

Wednesday, 18 January 2023

মনকলি উপন্যাস ১মপর্ব

 পর্ব -১

বড়ো গল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 

১৯/১১/২০


জীবনের রঙ মাঝে মাঝে বদলে যায়। যে সুখের স্বপ্ন নিয়ে একদিন ঘর বেঁধেছিল মনকলি, সে ঘর তার ভেঙে গেছে। 

নিজেকে বড়ো দামী মনে করতো মনকলি। বাবা মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে, পড়াশোনায় খুবই মেধাবী সেই সাথে অসাধারণ গানের গলা। পাড়ার ফাংশনে তার গান, সংলাপ থাকবেই। তার সাথে গান গাইতো একটি মারোয়ারী ছেলে, কিন্তু অসম্ভব রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, বারবার কি যেনো এক অমোঘ টানে ছুটে যেতো শান্তিনিকেতন, ছেলেটির নাম ছিলো রাজকুমার, সবাই তাকে ডাকতো বউয়া বলে। মনকলিও তাকে বউয়াদা বলেই সম্বোধন করতো। আর মনকলিকে সবাই তার বাড়ির নাম অর্থাৎ মিতুল বলে ডাকতো। মিতুলের চেহারা খুবই ফুটফুটে, টকটকে ফর্সা রঙ,একঢাল চুল,দুটি বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখ, অনেকেই তাকে ভিষণ পছন্দ করতো কিন্তু বউয়াদা যে তাকে নিজের মনে এক গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছিল তা সে জানতেই পারেনি। 

কথায় আছে সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও অবহেলা করতে নেই।

গুণ এবং রূপের এক প্রচ্ছন্ন অহংকার মনকলির মনকে কখন যেনো ঘিরে ধরেছিলো। বাড়িতেও সবার খুব আদরের ছিলো, মাসি পিসিরা বলতো এই মেয়ের জন্য আইপি এস, বা উচ্চপর্যায়ের কোনো পরিবারের সুপুরুষ ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে। শুধু বাবা বলতেন এখন ওসব আলোচনায় কান না দিয়ে নিজের পড়াশোনা টাই মন দিয়ে করে পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করে গড়ে তোল।রূপ দুদিনের, তারপর সব একঘেয়ে হয়ে যায় কিন্তু তোমার বিদ্যা, তোমার গান, তোমার জীবনের মূলমন্ত্র। আর একটা কথা যদি কখনও কাউকে ভালোবাসো তবে তার রূপ বা অর্থ দেখোনা, শুধু দেখো মানুষ টা যেনো প্রকৃতরূপে একজন মানুষ হয়। 

বাবার কথা সে অনেকটা মেনেছিলো কিন্তু সবটা মানতে পারেনি তাই হয়তো জীবনের এক পরম দুর্যোগের সামনে পড়তে হলো। 

ইতিহাসে ফাস্ট ক্লাস নিয়ে মাস্টার্স করে নেট পরীক্ষায় উত্তির্ন হল, পি এইচ ডি করতে করতেই সরকারি কলেজের লেকচারার হয়ে গেলো, তার সাথে চললো পুরো দমে গানের চর্চা। 

একসময় সে যখন এম এ ক্লাসে ভর্তি হয়েছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, তখন বউদা মাস্টার্স শেষ করে নেট দেবে কিনা ভাবছে, তার ইচ্ছে ছিলো বাকি পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে গিয়ে করার কিন্তু মনকলিকে ছেড়ে হয়তো যেতে পারছিলোনা। বউয়াদার রেজাল্ট সাধারণ মানের  সেকেন্ড ক্লাস ছিলো, দেখতেও সাধারণ ছিলো, গায়ের রং শ্যামলা, লম্বা দোহারা চেহারা, চোখ দুটি বড়ো সুন্দর আর গভীর ছিলো, কিন্তু কোনভাবেই তাকে সুপুরুষ বলা যায়না। 

এই বউয়াদা যখন তাকে ভালোবাসার কথা জানালো সে অত্যন্ত অহংকারী মনোভাব নিয়ে বললো, হ্যাঁ তোমার সাথে আমি গান গাই, ভালো ভদ্র ছেলে বলে মানি তাবলে কোনভাবেই তোমাকে আমার প্রেমিক বা জীবনের ভালোবাসা  বলে ভাবতেই পারিনা। তুমি তো আমার যোগ্য নও তাহলে এ প্রস্তাব নিয়ে কেনো এলে?  

বউয়াদা মুখটা কালো করে বললো সত্যি রে বড়ো ভুল হয়ে গেছে, আর কোনদিন তোর সামনে আসবোনা, আমায় ক্ষমা করে দিস। 

সত্যি এরপর থেকে কেউ তাকে আর পাড়ায় দেখতে পায়নি। পাড়ার ছেলেদের কাছে এবং অনেক মেয়েদের কাছেও সে খুব প্রিয় ছিলো, তার সাদাসিধে সুন্দর মিষ্টি ব্যবহারের জন্য। 

ওর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো বউয়দা শান্তিনিকেতনে চলে গেছে, ওখানে ওর কর্মজীবন শুরু করবে বলে। 

আজ মনকলি জীবন যুদ্ধে বিধ্বস্ত, আজ মনে হচ্ছে বউয়া দাকে তার বড়ো প্রয়োজন, কিন্তু কোথায় পাবে তাকে!  বাবার এই একটা কথাই সে অমান্য করেছিল , সাময়িক রূপ আর চাকচিক্যে ভুলে গিয়ে প্রবীরের হাত ধরেছিল পরম নির্ভয়ে, প্রবীর ছিলো বাইরে থেকে ডক্টরেট হয়ে আসা ছেলে, নটিংহ্যাম এ লেকচারার ছিলো, সে সব ভুলে প্রবীরের হাত ধরলো, এখানে প্রবীর কি করে বা ভবিষ্যতে ইউকেতে ফিরে যাবে কিনা সে বিষয়ে জানতেই চাইলোনা। 

এখানেই হল তার চরম পরাজয়। প্রবীর যে তার প্রতি  কর্তব্য করতোনা তা কিন্তু নয়। অনেক ভালোবাসা একএক সময় দেখাতো। মাঝে মাঝেই দামী উপহার নিয়ে আসতো। নিজের জন্মদিন আর বিয়ের তারিখ  খুব ঘটা করে পালন করতো। যখন মহিলা বান্ধবীদের মধ্যে থাকতো তখনই সে স্ত্রী কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, বান্ধবীদের সামনে স্ত্রী কে অপমান করে যেনো এক পৈশাচিক আনন্দ পেতো। আসতে আসতে মনকলি বুঝতে পারে সে ভুল করেছে, তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর ঠিক তখনই রোগের উপসম গুলো দেখা দিতে থাকে। একবার অপারেশন করতে হয় তখনই ধরা পরে রোগটা। এরপর সে ঠিক করে আর এখানে থাকবেনা সে বদলি নিয়ে চলে যাবে। 

কলকাতায় নানা লোকের প্রশ্ন ও কৌতুহল এড়াতে সে বদলি নিয়ে চলে এলো পুরুলিয়ায়। প্রবীরের প্রবীর বারমুখী হলেও অসুখের সময় সাধ্যমতো চিকিৎসা করিয়েছিল।সেও তখন ভাবতে পারেনি যে মনকলি তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যখন মনকলি জানালো তখন সে বললো এইসময় এই অবস্থায় তোমাকে কি করে একটা অজানা শহরে ছেড়ে দি আর ওখানে চিকিৎসা পাবে কি করে?  ঠাণ্ডা গলায় মনকলি বলেছিল, আমার জন্য আর নাই বা ভাবলে আমি মিউচুয়াল ডিভোর্স নেবো তোমার কাছে কোনো কিছু দাবী করবোনা শুধু ডিভোর্স টা দিয়ে দিও। উত্তরে প্রবীর বলেছিল, আমাকে তুমি যতোটা অমানুষ ভাবো আমি কিন্তু তা নই। তোমার চিকিৎসার জন্য আমি অনেক জায়গায় কথা বলেছি দরকার হলে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্লিজ এতবড়ো একটা অসুখ নিয়ে পুরুলিয়ায় চলে যেওনা। কিন্তু মনকলি চলে এসেছিল। যে ব্যাবহার সে এতদিন পেয়ে এসেছে তার সাথে মেলাতে পারছিলনা, তার কাছে সবটাই অভিনয় বলে মনে হয়েছে। 

পুরুলিয়ার নিস্তব্ধ বেলাভূমিতে চলে এলো, বলরাম পুর কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপিকা হয়ে এলো। 

বলরামপুরের একদিকে অযোধ্যা পাহাড় আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঘমুন্ডি শহর। বাঘমুন্ডি ছৌ নাচের জন্য বিখ্যাত। শৈশব থেকেই সে ছৌ নাচের খুব ভক্ত ছিল, ইচ্ছে আছে অধ্যাপনার সাথে সাথে ছৌ নাচের ওপর কিছু কাজ করার। রাঙামাটির কোলে লাল পলাশের বনে এসে এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ লাগলো তার মনে। অনেকটা যেনো তাকে শান্তিনিকেতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। 

বারবার অতীতের ভুলের কথা ভুলতে চেষ্টা করছে, না না প্রবীরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে বেঁচে গেছে শুধু নয় নিজের অহংকার দম্ভ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। এটুকু শিক্ষা তার হয়েছে বাইরের কোনো চাকচিক্য নয় মানুষকে বিচার করতে হয় তার অন্তরের সত্তা দিয়ে। বউয়াদার বাবারও কিন্তু অনেক পয়সা, বিরাটকায় লাল বাড়িটার ছবি এখনও তার চোখে ভাসে। আসা যাওয়ার পথের ধারেই বাড়িটা পড়তো, ওই বাড়িরই একটা চারচৌকো গ্রীল দেওয়া বারান্দায়  সে দাঁড়িয়ে থাকতো কবে থেকে। যখন সে স্কুল থেকে ফিরতো তখন দেখতো ওই বারান্দায় তার আসার পথের দিকে চেয়ে বউয়া দা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কলেজ থেকে ফেরার সময় ওই একই দৃশ্যপট। মাঝে মাঝে মনে হত পড়াশোনা করে কখন?  কিন্তু তার সব পড়াশোনা আর ভালোবাসা যে রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করেই ছিলো তা সেদিন সে বুঝতে পারেনি। 

একদিন রিহার্সালের সময় কথায় কথায় বলেছিলো, আমার বাড়ির লোক ভাবে আমি পাগল, কি করে এই গান আর বাংলা নিয়ে আমি এতো মাতামাতি করি, কিন্তু আমি কি করবো বল!  রবীন্দ্রনাথ যে আমার হৃদয়ের তন্ত্রে তন্ত্রে বয়ে চলেছে,তাঁর গানের অসাধারণ ফিলোসোফি আমাকে মুগ্ধ করে আর সেই টানেই মনে হয় চলে যাই কবির শিক্ষা নিকেতনে বিশ্বভারতীতে, 

অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা তুমি বাংলা এতো ভালো করে বুঝতে পারো কি করে?  

ম্লান হেসে সে উত্তর দিয়েছিল, আমার মায়ের কাছ থেকে, মা যে বিশ্বভারতীর ছাত্রী ছিলেন, 

তাইনাকি!  উনি কি বাঙালি? 

না, তবে কর্মসূত্রে আমার দাদুর পোস্টিং ছিলো বোলপুরে, পরবর্তী কালে দাদু বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিক্স পড়াতেন, আর আসাতে আসতে রবীন্দ্রনাথ কে জানতে চেষ্টা করেন, বুঝতে চেষ্টা করেন, নিজের অজান্তেই দাদু কখন যনো প্রবল রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে পড়েন। 

তারপর? 

তারপর আর কি, কোন এক পৌষমেলায় এসে মায়ের সাথে বাবার পরিচয় হয়, মায়ের টানেই বাবা বারবার ছুটে যেতেন শান্তিনিকেতনে, একসময় ওদের বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু এতো ভালোবেসে বিয়ে করেও মাকে বাবা তাঁর যোগ্য মর্যাদা কখনও দিতে পারেননি। 

আমি হওয়ার পর শেষ কটা বছর মা দাদুর কাছেই থেকে গিয়েছিলেন, ওখানেই একটা ছোটো স্কুলে পড়াতেন আর মন ভরে গান গাইতেন, আমিও মায়ের সাথে থেকে থেকে ওই একই দিকে মন পড়ে থাকলো, আজও তার থেকে বার হতে পারলাম না। বাবা শুধু বলতেন যে আমি যা ভালোবাসি তাই যেনো করি, তখন হয়তো মায়ের কথা ভেবেই বলতেন, মা যে ওতো তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তা বাবা বুঝতেই পারেন নি। মায়ের মৃত্যু বাবা মেনে নিতে পারেননি খুব ভেঙে পড়েছিলেন আর আমাকে আঁকড়ে থাকেন  এখন, আমার মধ্যে দিয়েই মাকে খোঁজেন হয়তো। 

মনকলিকে এ কথাগুলো খুব গভীর ভাবে স্পর্শ করলেও ভালোবাসা বা টান কোনদিন অনুভব করেনি। আজ কিন্তু বউয়াদার মতন মানুষকেই ফিরে পাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। 

কিন্তু কোথায় তাকে পাবে জানেনা। এখানে আসার আগে গিয়েছিল সে শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে খোঁজ করে জানতে পারে বউয়াদা পুরুলিয়ার কোনো কলেজের প্রফেসর হয়ে চলে এসেছে। সত্যি কথা বলতে সেও একই আশায় এখানে এসেছে যদি সে খুঁজে পায় তার পুরানো বউয়াদাকে, যে তাকে পাগলের মতন ভালোবাসতো, তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েই সে চলে এসেছিল, একরকম নিজেকে একলা করে শুধু নিজের কাজ করে গেছে শান্তিনিকেতনের নিরালা নিভৃত কোণে। ওখানে তার সাথে দেখা হয়েছিল তার পুরানো বন্ধু সুচরিতার সাথে, সুচরিতাও পড়ায় বিশ্বভারতীতে, সুচরিতার মুখেই শুনেছিল বউয়দা ফিলোসোফি তে ডক্টরেট করেছে, রবীন্দ্র দর্শনের ওপরই সে থিসিস লেখে যা বিপুল ভাবে সর্বত্র সমাদৃত হয়।  মাঝখানে দুবছর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল ইউরোপের ফিলোসফারদের ওপর কাজ করতে, তাদের দর্শন নিয়ে নানা তথ্য আলোচনা ও রিসার্চ করে,বিদেশের অনেক বড়ো বড়ো ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ানোর অফার পেয়েও নেয়নি, সুচরিতার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল আমার শিক্ষা আমি আমার দেশের ছেলেমেয়েদের দেবো, বিদেশের কোনো মোহ আমার নেই। 

সুচরিতার সাথে দুদিন ছিল তখন অনেক কথাই হয়েছিল। সুচরিতা বলেছিল আমি বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিলাম রে মানুষটাকে, 

কোনদিন বলিস নি? 

- হ্যাঁ রে বলেছিলাম, 

- কি বললো? 

- কবির কবিতায় উত্তর দিলো, " ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো এ তরী "। 

তোমাকে দেওয়ার মতন আমার কিছু আর নেই সুচরিতা, আমি নিশ্ব, সব কিছু একজনকে দিয়েই নিশ্ব হয়ে বসে আছি। শুধু শুধু তোমাকে ডেকে এনে অসম্মান করতে পারবোনা, আমাকে ক্ষমা করো। 

তারপরই পুরুলিয়ায় চলে যায়, যাবার আগে আমার সাথে দেখা করে বলে যায়, ভালো থেকো সুচরিতা, খুব ভালো থেকো, শুধু শুধু কষ্ট পেয়োনা, আমি জানি প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা বড়ো মর্মান্তিক, আমি চাইনা আমার জন্য কেউ এ কষ্ট পাক, মনে কোরো ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলে, নতুন করে বাঁচতে হবে তোমাকে, তোমার জন্য অনেকে হাত বাড়িয়ে দেবে, আমার শুভকামনা তোমার সাথে সবসময় থাকবে, যেদিন জীবনের পরিপূর্ণতায় ভরপুর হয়ে যাবে সেদিন এই দাদাটার কাছে এসো কেমন!  আজ আমি যাই। 

তারপরও সুচরিতা বলে যেতে লাগলো অনেক জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন কলেজ, কি ঠিকানা?  ম্লান হেসে উত্তর দিলো, আমি যে নিজেই জানিনা কোথায় হবে আমার ঠিকানা!  ঠিকানাবিহীন পথে চলে চলেই তো আমি অভ্যস্ত, পেয়ে যাবো কোন একটা ঠিকানা, 

- তাহলে কি করে জানলি বউয়াদা পুরুলিয়ায় গেছে? 

- এক কলিগের মুখে শুনেছিলাম পুরুলিয়ার কোন একটা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছে। 

সেই কথা শোনার পরে সে এক অসীম আশায় ভর করে পুরুলিয়ায় এসেছে। 

ক্রমশ


মনকলি উপন্যাস। প্রথম পর্ব

 পর্ব -১

বড়ো গল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 



জীবনের রঙ মাঝে মাঝে বদলে যায়। যে সুখের স্বপ্ন নিয়ে একদিন ঘর বেঁধেছিল মনকলি, সে ঘর তার ভেঙে গেছে। 

নিজেকে বড়ো দামী মনে করতো মনকলি। বাবা মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে, পড়াশোনায় খুবই মেধাবী সেই সাথে অসাধারণ গানের গলা। পাড়ার ফাংশনে তার গান, সংলাপ থাকবেই। তার সাথে গান গাইতো একটি মারোয়ারী ছেলে, কিন্তু অসম্ভব রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, বারবার কি যেনো এক অমোঘ টানে ছুটে যেতো শান্তিনিকেতন, ছেলেটির নাম ছিলো রাজকুমার, সবাই তাকে ডাকতো বউয়া বলে। মনকলিও তাকে বউয়াদা বলেই সম্বোধন করতো। আর মনকলিকে সবাই তার বাড়ির নাম অর্থাৎ মিতুল বলে ডাকতো। মিতুলের চেহারা খুবই ফুটফুটে, টকটকে ফর্সা রঙ,একঢাল চুল,দুটি বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখ, অনেকেই তাকে ভিষণ পছন্দ করতো কিন্তু বউয়াদা যে তাকে নিজের মনে এক গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছিল তা সে জানতেই পারেনি। 

কথায় আছে সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও অবহেলা করতে নেই।

গুণ এবং রূপের এক প্রচ্ছন্ন অহংকার মনকলির মনকে কখন যেনো ঘিরে ধরেছিলো। বাড়িতেও সবার খুব আদরের ছিলো, মাসি পিসিরা বলতো এই মেয়ের জন্য আইপি এস, বা উচ্চপর্যায়ের কোনো পরিবারের সুপুরুষ ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে। শুধু বাবা বলতেন এখন ওসব আলোচনায় কান না দিয়ে নিজের পড়াশোনা টাই মন দিয়ে করে পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করে গড়ে তোল।রূপ দুদিনের, তারপর সব একঘেয়ে হয়ে যায় কিন্তু তোমার বিদ্যা, তোমার গান, তোমার জীবনের মূলমন্ত্র। আর একটা কথা যদি কখনও কাউকে ভালোবাসো তবে তার রূপ বা অর্থ দেখোনা, শুধু দেখো মানুষ টা যেনো প্রকৃতরূপে একজন মানুষ হয়। 

বাবার কথা সে অনেকটা মেনেছিলো কিন্তু সবটা মানতে পারেনি তাই হয়তো জীবনের এক পরম দুর্যোগের সামনে পড়তে হলো। 

ইতিহাসে ফাস্ট ক্লাস নিয়ে মাস্টার্স করে নেট পরীক্ষায় উত্তির্ন হল, পি এইচ ডি করতে করতেই সরকারি কলেজের লেকচারার হয়ে গেলো, তার সাথে চললো পুরো দমে গানের চর্চা। 

একসময় সে যখন এম এ ক্লাসে ভর্তি হয়েছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, তখন বউদা মাস্টার্স শেষ করে নেট দেবে কিনা ভাবছে, তার ইচ্ছে ছিলো বাকি পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে গিয়ে করার কিন্তু মনকলিকে ছেড়ে হয়তো যেতে পারছিলোনা। বউয়াদার রেজাল্ট সাধারণ মানের  সেকেন্ড ক্লাস ছিলো, দেখতেও সাধারণ ছিলো, গায়ের রং শ্যামলা, লম্বা দোহারা চেহারা, চোখ দুটি বড়ো সুন্দর আর গভীর ছিলো, কিন্তু কোনভাবেই তাকে সুপুরুষ বলা যায়না। 

এই বউয়াদা যখন তাকে ভালোবাসার কথা জানালো সে অত্যন্ত অহংকারী মনোভাব নিয়ে বললো, হ্যাঁ তোমার সাথে আমি গান গাই, ভালো ভদ্র ছেলে বলে মানি তাবলে কোনভাবেই তোমাকে আমার প্রেমিক বা জীবনের ভালোবাসা  বলে ভাবতেই পারিনা। তুমি তো আমার যোগ্য নও তাহলে এ প্রস্তাব নিয়ে কেনো এলে?  

বউয়াদা মুখটা কালো করে বললো সত্যি রে বড়ো ভুল হয়ে গেছে, আর কোনদিন তোর সামনে আসবোনা, আমায় ক্ষমা করে দিস। 

সত্যি এরপর থেকে কেউ তাকে আর পাড়ায় দেখতে পায়নি। পাড়ার ছেলেদের কাছে এবং অনেক মেয়েদের কাছেও সে খুব প্রিয় ছিলো, তার সাদাসিধে সুন্দর মিষ্টি ব্যবহারের জন্য। 

ওর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো বউয়দা শান্তিনিকেতনে চলে গেছে, ওখানে ওর কর্মজীবন শুরু করবে বলে। 

আজ মনকলি জীবন যুদ্ধে বিধ্বস্ত, আজ মনে হচ্ছে বউয়া দাকে তার বড়ো প্রয়োজন, কিন্তু কোথায় পাবে তাকে!  বাবার এই একটা কথাই সে অমান্য করেছিল , সাময়িক রূপ আর চাকচিক্যে ভুলে গিয়ে প্রবীরের হাত ধরেছিল পরম নির্ভয়ে, প্রবীর ছিলো বাইরে থেকে ডক্টরেট হয়ে আসা ছেলে, নটিংহ্যাম এ লেকচারার ছিলো, সে সব ভুলে প্রবীরের হাত ধরলো, এখানে প্রবীর কি করে বা ভবিষ্যতে ইউকেতে ফিরে যাবে কিনা সে বিষয়ে জানতেই চাইলোনা। 

এখানেই হল তার চরম পরাজয়। প্রবীর যে তার প্রতি  কর্তব্য করতোনা তা কিন্তু নয়। অনেক ভালোবাসা একএক সময় দেখাতো। মাঝে মাঝেই দামী উপহার নিয়ে আসতো। নিজের জন্মদিন আর বিয়ের তারিখ  খুব ঘটা করে পালন করতো। যখন মহিলা বান্ধবীদের মধ্যে থাকতো তখনই সে স্ত্রী কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, বান্ধবীদের সামনে স্ত্রী কে অপমান করে যেনো এক পৈশাচিক আনন্দ পেতো। আসতে আসতে মনকলি বুঝতে পারে সে ভুল করেছে, তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর ঠিক তখনই রোগের উপসম গুলো দেখা দিতে থাকে। একবার অপারেশন করতে হয় তখনই ধরা পরে রোগটা। এরপর সে ঠিক করে আর এখানে থাকবেনা সে বদলি নিয়ে চলে যাবে। 

কলকাতায় নানা লোকের প্রশ্ন ও কৌতুহল এড়াতে সে বদলি নিয়ে চলে এলো পুরুলিয়ায়। প্রবীরের প্রবীর বারমুখী হলেও অসুখের সময় সাধ্যমতো চিকিৎসা করিয়েছিল।সেও তখন ভাবতে পারেনি যে মনকলি তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যখন মনকলি জানালো তখন সে বললো এইসময় এই অবস্থায় তোমাকে কি করে একটা অজানা শহরে ছেড়ে দি আর ওখানে চিকিৎসা পাবে কি করে?  ঠাণ্ডা গলায় মনকলি বলেছিল, আমার জন্য আর নাই বা ভাবলে আমি মিউচুয়াল ডিভোর্স নেবো তোমার কাছে কোনো কিছু দাবী করবোনা শুধু ডিভোর্স টা দিয়ে দিও। উত্তরে প্রবীর বলেছিল, আমাকে তুমি যতোটা অমানুষ ভাবো আমি কিন্তু তা নই। তোমার চিকিৎসার জন্য আমি অনেক জায়গায় কথা বলেছি দরকার হলে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্লিজ এতবড়ো একটা অসুখ নিয়ে পুরুলিয়ায় চলে যেওনা। কিন্তু মনকলি চলে এসেছিল। যে ব্যাবহার সে এতদিন পেয়ে এসেছে তার সাথে মেলাতে পারছিলনা, তার কাছে সবটাই অভিনয় বলে মনে হয়েছে। 

পুরুলিয়ার নিস্তব্ধ বেলাভূমিতে চলে এলো, বলরাম পুর কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপিকা হয়ে এলো। 

বলরামপুরের একদিকে অযোধ্যা পাহাড় আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঘমুন্ডি শহর। বাঘমুন্ডি ছৌ নাচের জন্য বিখ্যাত। শৈশব থেকেই সে ছৌ নাচের খুব ভক্ত ছিল, ইচ্ছে আছে অধ্যাপনার সাথে সাথে ছৌ নাচের ওপর কিছু কাজ করার। রাঙামাটির কোলে লাল পলাশের বনে এসে এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ লাগলো তার মনে। অনেকটা যেনো তাকে শান্তিনিকেতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। 

বারবার অতীতের ভুলের কথা ভুলতে চেষ্টা করছে, না না প্রবীরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে বেঁচে গেছে শুধু নয় নিজের অহংকার দম্ভ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। এটুকু শিক্ষা তার হয়েছে বাইরের কোনো চাকচিক্য নয় মানুষকে বিচার করতে হয় তার অন্তরের সত্তা দিয়ে। বউয়াদার বাবারও কিন্তু অনেক পয়সা, বিরাটকায় লাল বাড়িটার ছবি এখনও তার চোখে ভাসে। আসা যাওয়ার পথের ধারেই বাড়িটা পড়তো, ওই বাড়িরই একটা চারচৌকো গ্রীল দেওয়া বারান্দায়  সে দাঁড়িয়ে থাকতো কবে থেকে। যখন সে স্কুল থেকে ফিরতো তখন দেখতো ওই বারান্দায় তার আসার পথের দিকে চেয়ে বউয়া দা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কলেজ থেকে ফেরার সময় ওই একই দৃশ্যপট। মাঝে মাঝে মনে হত পড়াশোনা করে কখন?  কিন্তু তার সব পড়াশোনা আর ভালোবাসা যে রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করেই ছিলো তা সেদিন সে বুঝতে পারেনি। 

একদিন রিহার্সালের সময় কথায় কথায় বলেছিলো, আমার বাড়ির লোক ভাবে আমি পাগল, কি করে এই গান আর বাংলা নিয়ে আমি এতো মাতামাতি করি, কিন্তু আমি কি করবো বল!  রবীন্দ্রনাথ যে আমার হৃদয়ের তন্ত্রে তন্ত্রে বয়ে চলেছে,তাঁর গানের অসাধারণ ফিলোসোফি আমাকে মুগ্ধ করে আর সেই টানেই মনে হয় চলে যাই কবির শিক্ষা নিকেতনে বিশ্বভারতীতে, 

অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা তুমি বাংলা এতো ভালো করে বুঝতে পারো কি করে?  

ম্লান হেসে সে উত্তর দিয়েছিল, আমার মায়ের কাছ থেকে, মা যে বিশ্বভারতীর ছাত্রী ছিলেন, 

তাইনাকি!  উনি কি বাঙালি? 

না, তবে কর্মসূত্রে আমার দাদুর পোস্টিং ছিলো বোলপুরে, পরবর্তী কালে দাদু বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিক্স পড়াতেন, আর আসাতে আসতে রবীন্দ্রনাথ কে জানতে চেষ্টা করেন, বুঝতে চেষ্টা করেন, নিজের অজান্তেই দাদু কখন যনো প্রবল রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে পড়েন। 

তারপর? 

তারপর আর কি, কোন এক পৌষমেলায় এসে মায়ের সাথে বাবার পরিচয় হয়, মায়ের টানেই বাবা বারবার ছুটে যেতেন শান্তিনিকেতনে, একসময় ওদের বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু এতো ভালোবেসে বিয়ে করেও মাকে বাবা তাঁর যোগ্য মর্যাদা কখনও দিতে পারেননি। 

আমি হওয়ার পর শেষ কটা বছর মা দাদুর কাছেই থেকে গিয়েছিলেন, ওখানেই একটা ছোটো স্কুলে পড়াতেন আর মন ভরে গান গাইতেন, আমিও মায়ের সাথে থেকে থেকে ওই একই দিকে মন পড়ে থাকলো, আজও তার থেকে বার হতে পারলাম না। বাবা শুধু বলতেন যে আমি যা ভালোবাসি তাই যেনো করি, তখন হয়তো মায়ের কথা ভেবেই বলতেন, মা যে ওতো তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তা বাবা বুঝতেই পারেন নি। মায়ের মৃত্যু বাবা মেনে নিতে পারেননি খুব ভেঙে পড়েছিলেন আর আমাকে আঁকড়ে থাকেন  এখন, আমার মধ্যে দিয়েই মাকে খোঁজেন হয়তো। 

মনকলিকে এ কথাগুলো খুব গভীর ভাবে স্পর্শ করলেও ভালোবাসা বা টান কোনদিন অনুভব করেনি। আজ কিন্তু বউয়াদার মতন মানুষকেই ফিরে পাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। 

কিন্তু কোথায় তাকে পাবে জানেনা। এখানে আসার আগে গিয়েছিল সে শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে খোঁজ করে জানতে পারে বউয়াদা পুরুলিয়ার কোনো কলেজের প্রফেসর হয়ে চলে এসেছে। সত্যি কথা বলতে সেও একই আশায় এখানে এসেছে যদি সে খুঁজে পায় তার পুরানো বউয়াদাকে, যে তাকে পাগলের মতন ভালোবাসতো, তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েই সে চলে এসেছিল, একরকম নিজেকে একলা করে শুধু নিজের কাজ করে গেছে শান্তিনিকেতনের নিরালা নিভৃত কোণে। ওখানে তার সাথে দেখা হয়েছিল তার পুরানো বন্ধু সুচরিতার সাথে, সুচরিতাও পড়ায় বিশ্বভারতীতে, সুচরিতার মুখেই শুনেছিল বউয়দা ফিলোসোফি তে ডক্টরেট করেছে, রবীন্দ্র দর্শনের ওপরই সে থিসিস লেখে যা বিপুল ভাবে সর্বত্র সমাদৃত হয়।  মাঝখানে দুবছর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল ইউরোপের ফিলোসফারদের ওপর কাজ করতে, তাদের দর্শন নিয়ে নানা তথ্য আলোচনা ও রিসার্চ করে,বিদেশের অনেক বড়ো বড়ো ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ানোর অফার পেয়েও নেয়নি, সুচরিতার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল আমার শিক্ষা আমি আমার দেশের ছেলেমেয়েদের দেবো, বিদেশের কোনো মোহ আমার নেই। 

সুচরিতার সাথে দুদিন ছিল তখন অনেক কথাই হয়েছিল। সুচরিতা বলেছিল আমি বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিলাম রে মানুষটাকে, 

কোনদিন বলিস নি? 

- হ্যাঁ রে বলেছিলাম, 

- কি বললো? 

- কবির কবিতায় উত্তর দিলো, " ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো এ তরী "। 

তোমাকে দেওয়ার মতন আমার কিছু আর নেই সুচরিতা, আমি নিশ্ব, সব কিছু একজনকে দিয়েই নিশ্ব হয়ে বসে আছি। শুধু শুধু তোমাকে ডেকে এনে অসম্মান করতে পারবোনা, আমাকে ক্ষমা করো। 

তারপরই পুরুলিয়ায় চলে যায়, যাবার আগে আমার সাথে দেখা করে বলে যায়, ভালো থেকো সুচরিতা, খুব ভালো থেকো, শুধু শুধু কষ্ট পেয়োনা, আমি জানি প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা বড়ো মর্মান্তিক, আমি চাইনা আমার জন্য কেউ এ কষ্ট পাক, মনে কোরো ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলে, নতুন করে বাঁচতে হবে তোমাকে, তোমার জন্য অনেকে হাত বাড়িয়ে দেবে, আমার শুভকামনা তোমার সাথে সবসময় থাকবে, যেদিন জীবনের পরিপূর্ণতায় ভরপুর হয়ে যাবে সেদিন এই দাদাটার কাছে এসো কেমন!  আজ আমি যাই। 

তারপরও সুচরিতা বলে যেতে লাগলো অনেক জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন কলেজ, কি ঠিকানা?  ম্লান হেসে উত্তর দিলো, আমি যে নিজেই জানিনা কোথায় হবে আমার ঠিকানা!  ঠিকানাবিহীন পথে চলে চলেই তো আমি অভ্যস্ত, পেয়ে যাবো কোন একটা ঠিকানা, 

- তাহলে কি করে জানলি বউয়াদা পুরুলিয়ায় গেছে? 

- এক কলিগের মুখে শুনেছিলাম পুরুলিয়ার কোন একটা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছে। 

সেই কথা শোনার পরে সে এক অসীম আশায় ভর করে পুরুলিয়ায় এসেছে। 

ক্রমশ