Thursday, 23 February 2023

মনকলি - পর্ব ৫

মনকলি --৫
ক্রমশ রাহুলের গাড়ি ছুটে চলেছে শান্তিনিকেতনের দিকে। গুসকরা পার হয়ে গেলো আর কিছুটা এগোলেই বোলপুর। কোপাই নদীর কাছে এসে গাড়ি একটু থামালো। আকাশে আজ পূর্ণ চাঁদ  রাহুুল নামলো কোপাইয়ের ধারে। নেমে গেলো তরতর করে নদীর একদম কাছে। পাথর কেটে কেটে তিরতির করে এগিয়ে যাচ্ছে নদীটা রাহুল দেখলো চাঁদের ছায়াটা স্থির হয়ে আছে , বড়ো শান্ত রূপ তার। মনে হলো কোথায় যেনো চাঁদের  এই ছায়ার সাথে  মিল আছে সুচরিতার। একান্ত নীরব নীরবতার মধ্যে দিয়ে পরিপূর্ণ তার হৃদয়ের ভালোবাসা। 
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো,রাহুল দেখলো সুচরিতার ফোন। ছেলেমানুষের মতন উচ্ছ্বসিত হয়ে রাহুল, আমি আসছি সুচি আমি এখনই আসছি। আমাকে যে আসতেই হবে তোমার কাছে। 
সুচরিতা কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে গেলো তার বউয়াদার উচ্ছ্বসিত গলা শুনে ভাবলো, এতোদিনে কি তার অপেক্ষার দরজায়
 সত্যি বসন্তের বাতাস লাগলো? কিন্তু মনকলি ও য অনেক আশা নিয়ে পুরুলিয়ায় গেলো চাকরি নিয়ে, ওকে যে তো সুচরিতাই বলেছিল যে তোর ভালোবাসা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে,
 তোকে শুধু খুঁজে নিতে হবে। 
কিন্তু সে কি করবে!  তার তো কিছুর করার নেই  তখনও পর্যন্ত তো সে জানতো বউদার মন জুড়ে
শুধু মনকলি আছে। তাই সেদিন তার প্রেম মর্যাদা  পায়নি  বউদার কাছে, আজ সে কি করবে! কিছু  তো করার নেই  কিছুটা  অপমানের সাথে হলেও বউয়াদা সত্যি তাকে ভালোবাসা অর্পণ করে তবে তা ফিরিয়ে দেওশার ক্ষমতা তার নেই। 
একটু পরেই বেল বাজলো  তারমানে বউদা এসে গেছে। শান্ত  ধীর পায়ে গিয়ে সে দরজা খুলে  দিলো, রাহুল প্রথমে একটু দাঁড়ালো তারপর এগিয়ে এসে দু'হাতে সুচরিতা কে বুকের কাছে টেনে আনলো তারপর তার মুখটা দু,হাতের তালুতে ধরে বললো, আমাকে গ্রহণ করবে তো?  
আমি তোমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে বুঝতে পারলাম মনটা আমার পুরোপুরি  বদলে গেছে। 
উচ্ছল দাম্ভিক কোনো মুখের আড়াল থেকে একটা শান্ত স্নিগ্ধ সুন্দর দুটো কালো চোখের মায়াভরা দৃষ্টি ভেসে উঠছে। মনে হলো তখন, উচ্ছল ঝর্ণা পাহাড়ের অনেক বাঁকের ফাঁকে হারিয়ে যায় কি শন্ত নদীটা তিরতির শব্দে বয়ে চলে। 
সে সুচরিতা কে দু'হাতের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বললো, নেবে তো আময়? 
সুচরিতার এতোদিনে বাঁধ ভেঙে গেলো, সে বউয়ার বুকে মাথা রেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো। 
বউদা তার মাথায় হাত রেখে বললো, আমার এ ভালোবাসা অন্তর থেকে উঠে আসা পবিত্র ভালোবাসা।
কিন্তু মনকলি কে কি বলবে বউদা?  
আমার তো কিছু জবাব দেওয়ার নেই সুচরিতা, 
আর কেনোই বা জবাব দেবো বলো তো? 
হয়তো তুমি বলবে আমিই বা কেনো আসবো তোমার কাছে? জবাবে আমি বলবো আমি তোমাকে কোনো অসম্মান করিনি বা বলিনি যে তুমি আমার যোগ্য নও খুব শান্ত ভাবে নিজের কথা জানিয়েছিলাম। আসলে রোজ তোমাকে দেখতাম বলে বা তোমার হাতের প্রচুর যত্ন পেতাম বলে হয়তো নিজের মনকে বুঝতে পারিনি, ধরে নিয়েছিলাম এ যত্ন গভীর বন্ধুত্বের অঙ্গীকার। কিন্তু যে মুহূর্তে তোমাকে ছেড়ে চলে এলাম তখন শুধু তুমি আমার মনে জুড়ে বসলে, মনকলি কোথায় হারিয়ে গেলো। 
নিজেকে নিজে বলছিলাম, ' এ আমি কি করলাম!  নিজেকে নিজে বুঝতে পারিনি আর পারলামনা আর একজনের গভীর ভালোবাসার মর্যাদা দিতে। তখুনি তেমার কাছে আসতে পারছিলাম না কারণ লজ্জা আর অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছিলাম। যে নিজে এসে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল তাকে কেনো ফিরিয়ে দিলাম!  বড়ো বোকা আমি নিজেই বুঝিনি নিজেকে আর একজনের ভালোবাসায় মূল্য দিতে পারলামনা। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবেনা তো! 
কি করে ফিরিয়ে দে বলো তো!  সেই কোন ছোটবেলা থেকে ভালোবেসে আসছে, আজ যখন সে নিজে এসে কাছে দাঁড়িয়ে আছে তাকে ফিরিয়ে দেবার মতন ক্ষমতা আমার নেই। শুধু মনকলির সাথে বন্ধত্বটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। 
কেনো?  আমার জন্যে?  আমার মনের ঘরটা যে ছোটো সে ঘর থেকে একবার কেউ বেরিয়ে গেলে আর দ্বিতীয় বার ঢোকার জায়গা থাকেনা। 
কিন্তু আমি যে ওকে বলেছিলাম, বউয়াদা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে, তুই পুরুলিয়ায় যা খুব সম্ভব বউয়াদা পুরুলিয়া গেছেন। 
আচ্ছা সুচরিতা এ উত্তরের ভারটা তুমি আমার ওপর দাও, যা সত্যি আমি তাই বলবো  আর তুমি যে নির্দোষ তাও বলবো যদিও এতো  কিছু  বিশ্লেষণ করে বলার জন্য আমরা বাধ্য নই ওর কাছে। বওয়া  সুচরিতাকে আরও কাছে টেনে ওরা কপালে পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বললো, কি মেয়েরে বাবা!  কখন এসেছি এতোটা পথ ধরে,এক কাপ চাও দিলো না।আবেশে সুচরিতার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল, বউয়াদার কথা শুনে   নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য ছটপট করে উঠে বললো, আরে এরকম করে ধরে রাখলে চা করবো  কি করে?  
তা আমি জানিনা। তারপরই হঠাৎ  ওকে গভীর আবেগে কাছে টেনে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে চোখ, ঠোঁট, গলা আকুল চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগলো, এই আমার ভালোবাসা, এই আমার সব, তোর জন্যই আমার অপেক্ষা ছিলো রে শুধু বুঝতে দেরি হয়ে গেলো। 
ভালোলাগায় সুচরিতার মুখ ঢলে পরেছিল বউয়াদার বুকের ওপর, মনে হচ্ছিল তার কোনো জ্ঞান নেই। জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো শুধু আদরে পেট ভরবেনা, চা টা করে আনি আগে। 
ক্রমশ 

No comments: