Sunday, 12 February 2023

মনকলি ৪ র্থ পর্ব

মনকলি পর্ব ৪
পারমিতা চ্যাটার্জি 


পরের দিন মনকলির প্রথম জয়েনিং। মনে মনে ভিষণ টেনশন। যাই হোক সময় মতন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে চলে গেলো কলেজের দিকে। 
বলরামপুর কলেজে পৌঁছে প্রথমে তাকে টিচার্সদের কমন রুমে বসতে দেওয়া হয়, একজন ক্লার্ক নির্মল নামে তাকে বললো, এখানে বসুন আপনি ভাইসপ্রিন্সিপাল সাহেব এলে আপনাকে ডেকে নেবো। বসে থাকতে থাকতেই কলেজের লেকচারারদের সাথে পরিচয় হয়ে যায়।ওদের কাছেই জানতে পারে রাহুল স্যার মানে ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব খুব ভালো মানুষ। তাদের কালচারাল ফাংশনে উপস্থিত থাকেন এবং খুব উত্সাহ দিয়ে থাকেন। 
মনকলির মনে কেমন একটা খটকা লাগলো। যাইহোক দুরুদুরু বুকে ডাকের অপেক্ষায় বসে আছে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতো হলো না। একটু পরেই নির্মল বলে ছেলেটা এসে তাকে নিয়ে গিয়ে ভাইস প্রিন্সিপালের রুমের সামনে দিয়ে এসে বললো - যান, আপনাকে ডাকছেন স্যার। 
মনকলি ভেজানো দরজা খুলে মুখ নীচু করেই বললো, আসবো স্যার? 
- হ্যাঁ আসুন বলেই মুখ তুলেই চমকে উঠলেন রাহুল শাউ, তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, বসুন। 
আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দিন। 
মনকলিও কম ঘাবড়ে যায়নি, সে ও নিজেকে সামলে নিলো। অয়েন্টমেন্ট লেটারটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে যেনো একটু কেঁপে গেলো, রাহুল তার সেই কাঁপুনিটা লক্ষ্য করলো কিন্তু মুখে কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিলো শুধু  তারপর নিজের সই সাবুদ যা কারার করে বললো নির্মল আপনাকে রুটিন দিয়ে দেবে। আজ প্রথম দিন ওই ক্লাসে পৌঁছে দেবে।
কাঁপা গলায় মনকলি বললো, আমার যে অনেক কথা ছিলো, 
আমার তো আর কারুর সাথে কোনো কথা নেই। এখানে নতুন কেউ এলে সবসময় একটা ওয়েলকাম সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়, হল ঘরে প্র্যাকটিস চলছে, আপনি ইচ্ছে করলে ওখানেও যেতে পারেন। আমাকে একটু বেরোতে হবে, দুতিনদিনের জন্য শান্তিনিকেতন যাচ্ছি আমার এক বন্ধুর কাছে। আশাকরি আপনার কোনো অসুবিধা হবেনা, বলে হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বললো কলেজটাকে আপন করে নিতে হবে, হ্যাঁ ভালোবেসে পড়াতে হবে দেখবেন সবাই আপনাকে ও কতো আপন করে নেবে। লাল মাটির মানুষরা বড়ো সরল আর সাদাসিধা হয়।বলেই ফোনে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন, মনকলি বেরিয়ে আসার সময় শুনতে পেলো বউয়াদা বলছে, সুচরিতা, আমি বউয়াদা বলছি, আজই পৌঁছে যাচ্ছি শান্তিনিকেতনে আর রাতের খাবারটা তোমার কাছেই  খাবো। 
আরও কথা বলে যাচ্ছে, ওপাশ থেকেও হয়তো উত্তর আসছে। মনকলি একদম ভেঙে পড়লো, মনে মনে বললো, তুমি এভাবে আমাকে ভুলে গেলে!  এতো দূরে সরিয়ে দিলে, আমার কথাটা শুনলেও না একবার। 
সত্যি বউয়ার কোনো আবেগ এলোনা, এতোদিন পরে তার প্রথম জীবনের ভালোবাসাকে চোখের সামনে দেখেও। 
তবে কি সত্যি সেদিনের বউয়াদা আর আজকের রাহুলের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। না কি প্রতিশোধ নেবার প্রবল ইচ্ছা। নিজেকেই প্রশ্ন করে যাচ্ছে রাহুল। 
গাড়ি হু হু করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার  দু'ধারে  সবুজ গাছের সারি, তাল তমালের অরণ্য। তারই রাস্তায় লাল সিমূলে ভরা পাতাবিহীন গাছ, মাঝখানে পলাশ ফুলের  লাল রঙ  উঁকি  মারছে সবুজ পাতার মাঝে বসে। 
কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া দুলছে বসন্তের হাওয়ায়, রাহুলের মনটাও দোদুল্যমান এই ভরা বসন্তের আগমনে। সত্যি সে কাকে ভালোবাসে?  যে তাকে খুব বাজে ভাবে অপমান করে একদিন ফিরিয়ে দিয়ে উচ্ছল জীবনের  হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল। ফিরে তাকায়নি একবার ছোটবেলা থেকে একসাথে বড়ো হয়ে ওঠা একজনের মুখের কথা আর একজন সে ও বাল্য সখি নিস্তব্ধে নীরবে তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে, চেষ্টা করেও পারছেনা জীবনের দরজাটা অন্যকারও জন্য খুলে দিতে। 
হ্যাঁ তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যতা হয়তো   সন্ধ্যাবেলার নিভু নিভু দীপ শিখার মতন। কিম্তু ভালোবাসায় ভরপুর, সেই স্নিগ্ধ শান্ত সৌন্দর্য  তার চোখের আকুলতাকে বার বার ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উচ্ছল ঝর্ণার দিকে না এগোনই ভালো। যে ঝর্ণার পাথুরে আঘাতে তার মন একদিন ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।। 
তার এই ভাবনার  মাঝেই এসে গেলো বর্ধমান। 
একটু এগিয়ে  একটা মিষ্টি দোকানে বসে গরম সিঙারা কচুরি আর ল্যাংচা খেয়ে নিল। কিছু ল্যাংচা সুচরিতার জন্য কিনে নিলো। ভালোবাসার এই টানাপোড়েনে আজ সুচরিতার স্থান তার জীবনে সত্যি পাকা হয়ে গেছে। 
ক্রমশ 


No comments: