Monday, 30 January 2023

প্রেম এসেছিল

Paromita creationপ্রেম এসেছিল
পারমিতা চ্যাটার্জি 

যে প্রেম এসেছিল সেদিন,
সে প্রেম তো তোমার নয়,
তবে কেন অন্ধকারে হাতড়ে  বেড়াও তাকে?
সেদিন আকাশে ছিলনা চাঁদের আলো,
ঘন মেঘের কালো ছায়ায় ঢাকা
নিবিড় তিমির আকাশটা 
হেসে উঠেছিল ব্যাঙ্গের হাসি।
বোঝনি তুমি সেই ছলনা,
উচ্ছলিত উদ্‌বেলিত ঝর্ণার মতোন তোমার প্রেম
বয়ে চলছিল পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেতে খতে,
ডুবন্ত মনটা খুঁজে ফিরছিল
একফালি সবুজ মাটি,
তুমি পারোনি দিতে।
 
   আজ দেখো   আকাশে কত তারার মালা,
গাছ ঢাকা দিঘির জলে কাঁপছে পূর্ণিমার চাঁদের ছায়া,
তুমি চাইছো আসতে কাছে,
দুহাত দিয়েছ বাড়িয়ে,
চাঁদ তবু এলোনা কাছে
শূণ্য বাতায়নের রুদ্ধ কবাট
গেলোনা খুলে তোমার আওহ্বানে।

Saturday, 28 January 2023

পারমিতা ক্রিয়েশনস

মনকলি ২য় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প

মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 
মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে? 
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  
ক্রমশ

মনকলি --২ য় পর্ব

Paromita creationমনকলি ২য় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প

মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 
মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে? 
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  
ক্রমশ

Friday, 27 January 2023

অন্য শ্রাবণ

পারমিতা চ্যাটার্জী

শ্রাবণের শুরু হতেই মনটা কিছু পাওয়ার নেশায় মেতে ওঠে, কখনও বা হারাই হারাই হয়-- কি যেন হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের বৃষ্টি ভেজা প্রাঙ্গন থেকে।
প্রতি শ্রাবণই নিয়ে আসে নতুন ভেজা ফুলের গন্ধ --
শ্রাবণ শেষে সে গন্ধটাও মিলিয়ে যায়--
জীবন থেকে এক একটা শ্রাবণ হারিয়ে যাচ্ছে -- কোথায় কোনখানে?  কে তার খবর রাখে--।
মনকে বলি -- মন মেনে নাও এই হারিয়ে যাওয়া -- হারিয়ে তো যাবেই জীবন তাকিয়ে থাকবে আবার আগামী শ্রাবণের দিকে -- কি খবর নিয়ে আসে সেই অপেক্ষায় --।
তিথি কলেজ থেকে ফিরে একমনে বৃষ্টি দেখছিল-- এই শ্রাবণের বৃষ্টিতেই সে জীবনের অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছিল আবার পেয়েওছিল অনেক কিছু--- শ্রাবণের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় সে হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে অনুপমের কাছে-- দুজনে একই কলেজে পড়ত--- অনুপম তার থেকে দুবছরের সিনিয়র ছিল-- সে ছিল বিজ্ঞানের ছাত্র,  আর তিথি ছিল একবারেই বিপরীত মেরুর ছাত্রী -- দর্শন নিয়ে সে এম এ পাশ করেছে--- তাও কি করে যে দুজনে দুজনের প্রেমে পরে গিয়েছিল তা আজ আর মনে পরেনা--। হারিয়ে যে কেন গিয়েছিল কি এক অমোঘ টানে, আজ তিরিশ বছর পরেও তা মনের ক্যানভাসে ছবি হয়ে জেগে ওঠে একটি হারিয়ে যাওয়া শ্রাবণ সন্ধ্যা। 
ঘটনার পরের দিনই অনুপম তাকে নিয়ে গিয়ে কালি মন্দিরে  বিয়ে করে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল --। পরের দিন বাড়ী চলে গিয়েছিল-- ওর বাবা কৃষ্ণনগরে থাকত--  ওখানকার খুব নাম করা উকিল ছিল-- তাছাড়া ওখানে ওদের অনেক জমিজমা ও ছিল-- এককথায় বলতে গেলে খুবই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে-- ও কলকাতায় মেসে থেকে পড়াশোনা করত। আর তিথির বাবা ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ অফিসার-- মাও একজন নামকরা স্কুলের টিচার। -- ওদের পরিবার মানে বাবা মা দুজনেই খুবই আধুনিক মনষ্কের মানুষ ছিলেন।
তারপর দিন থেকে আর অনুপমকে দেখতে পায়নি --। অনেকদিন পর তাদের এক কলেজের বন্ধুর হাত দিয়ে অনুপম একটা চিঠি পাঠিয়েছিল-- তাতে লেখা ছিল বাড়ী এসে দেখে মা তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন সামনের মাসেই বিয়ে-- তাদের সব কথা শুনে বললেন এ বিয়ে না করলে মায়ের মরা মুখ দেখতে হবে-- প্রথম চারদিন মাকে একফোঁটা জল ও খাওয়ানো যায়নি-- বাধ্য হয়ে সে বিয়েতে মত দেয়-- তারপর মা উঠে জল খান--।
আমার কিছু করার ছিলনা-- কিন্তু এই বেড়া একদিন আমি ভেঙে ঠিক তোমার কাছে পৌঁছে যাবো --। সে আজ তিরিশ বছর আগের কথা--। তারপর থেকে জীবনের এক একটা শ্রাবণ চলে যাচ্ছে অনুপম আর আসেনি--।
তিথির বাবা মাই সব দায়িত্ব নিয়ে মানুষ করেন শায়ন কে -- তার আর অনুপমের সন্তান -- অনুপম শায়নের অস্তিত্বের কথা জানেও না, তিথি ও আর জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি।

অনুপমের কথা--
তিথি আমি জানি তোমার কাছে আমি এখন জগতের সবচেয়ে ঘৃণ্য মানুষ কিন্তু আমি যে কতখানি নিরুপায় ছিলাম তা একমাত্র ভগবানই জানেন-- চারদিন ধরে নিজের মাকে একফোঁটা জল না খেয়ে দেখেও আমি অবিচল ছিলাম কিন্তু যখন দেখলাম মায়ের প্রেসার ফল করছে, বাবা এসে বললেন -- মাকে না মেরে কি শান্তি হচ্ছেনা?  বাধ্য হলাম তখন নিজের ভালোবাসাকে বলি দিতে।
আমি আমার মনের কথা কাউকে বোঝাতে পারিনি-- তুমিও হয়তো বুঝবেনা -- তাই আমার চিঠির কোন উত্তর পাইনি--। জানিনা তুমি কোথায় আছ,  কেমন আছ?
প্রাণহীন ভালোবাসা হীন একটা সংসার জালে আবদ্ধ থাকা যে কি যন্ত্রণার তা কেউ বুঝবেনা--।
কিন্তু আজ এতদিন পর তোমার কথাই বসে ভাবছি তুমি জানতেও পারবেনা-- আমার শুধু মনে হয় ভেঙে গেছে আমার শ্রাবণের ভালোবাসা -- ভেঙে ফেলেছি প্রতিশ্রুতি, শ্রাবণ সন্ধ্যায় বিবাহের অঙ্গীকার -- তোমার কাছে যাবার মতন মুখ আর নেই -- কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবো তোমার কাছে? আমার চোখে এখনও তুমি সেই লম্বা বিনুনি বাঁধা চন্চলা তরুণী -- নাই বা দেখলাম তোমার বার্দ্ধক্যর ছবি--। একটা কথা স্বীকার না করে পারছিনা আমার  স্ত্রী শ্রুতি বড় ভালো আর সরল মেয়ে -- তোমার কথা ওকে আমি সব বলেছিলাম -- ও সব নিঃশব্দে মেনে নিয়ে আমায় ভালোবেসেছে-- আমায় অনেক বার বলেছে তোমার খোঁজ করতে,  আমিও খুজে ছিলাম, পাইনি তোমায় আর--। 
শ্রুতিকে  দুবছর ছুঁই নি -- কিন্তু ওর সহ্যশক্তি মায়া মমতা, গোপন অশ্রু সব আমায় ভুলিয়ে দিল-- কখন যেন নিজের অজান্তেই ওর কথা ভাবতে শুরু  করলাম--- ভাবছো তো? কি অমানুষ আমি? কিন্তু তিথি তুমিই বল-- ওর তো কোন দোষ ছিলনা-- তবুও নিজের অধিকার নিয়ে কখনও আমায় বিব্রত করে তোলেনি-- নিঃশব্দে সব মানতে মানতে একদিন কঠিন নার্ভের অসুখের শিকার হয়-- দুটো মেয়ের জীবন আমার জন্য নষ্ট হচ্ছে?  নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করি-- আমি কি? আমি কি মানুষ?  সেদিনের শ্রাবণ সন্ধ্যার বৃষ্টিভেজা স্মৃতি না হয় মিথ্যা হয়ে যাক একজনকে অন্তত ভালো ভাবে বাঁচতে সাহায্য করি-- এরপরই দুঃখী নিরপরাধ মেয়েটাকে কাছে টেনে নিয়ে তাকে স্ত্রীর সম্মান দি-- ভালো হয়তো বাসতে পারিনি--- কিন্তু তার প্রতি মায়া মমতা, স্নেহর আমার কোন অভাব ছিলনা-- আমাদের একটি কন্যা সন্তানও হয়--। 
শ্রুতিকেও বেশিদিন আমি ধরে রাখতে পারিনি-- দীর্ঘদিনের অযত্নে অবহেলায় ভেঙে পরা শরীর আর জোড়া লাগলো না -- শ্রুতি চলে গেলে আমায় ছেড়ে -- যেন এক চরম শাস্তি দিয়ে গেল-- যাওয়ার আগে আমায় বলে গিয়েছিল-- " আর তো কোন বাধা রইল না, এবার দিদিকে ভালো করে খুজে নিয়ে এসো--।
না সত্যি কথা বলতে আজ আর দ্বিধা করবনা তোমায়-- আমি শ্রুতির স্মৃতিকে মেরে ফেলতে চাইনি-- বরং খুব যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছি---।
শুধু এই শ্রাবণ সন্ধ্যা গুলোয় মনটা তোমার কাছে চলে যায়-- অপেক্ষায় থাকি এক শ্রাবণ চলে গেলে আর একটা শ্রাবণের--।

তিথি জানলা ধরে শ্রাবণের বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবছে এই শ্রাবণটাও চলে যাবে-- আসবেনা কেউ--।

নীরব অভিমান

Paromita creationনীরব অভিমানে
পারমিতা চ্যাটার্জী 

পায়ে পায়ে এসেছিলাম চলে অনেকটা দূরে,
মাঝপথে দেখা হয়েছিল তোমার সাথে,
তুমি ডাক দিয়েছিলে আমায়,
পথের মাঝে  বটগাছের ছায়ায়
আমরা নিয়েছিলাম ভালোবাসার আশ্রয়।
তারপর হাত ধরে এগিয়ে গেলাম
আরো অনেকটা পথ,
বসন্তের উন্মত্ত বাতাসে 
দুজনেই এলোমেলো,
চাঁদ ওঠা বনজোছনায়,
হাসনুহানার গন্ধে জড়িয়ে নিলাম
একে অপরকে এক গভীর অনুভূতির আবর্তে।
হঠাৎ পধের বাঁকটা ভাগ হয়ে গেল দুদিকে,
আমরা চললাম ভিন্ন পথে,
বটগাছের তলায় ভালোবাসার ছায়াটা
আজো দুলে যায়,
বনজোছনার আলো নীরবতার কোণে
উকি দিয়ে যায়,
জানিনা কি বলতে চায়,
শুধু নীরবতা চেয়ে থাকে
নীল আকাশের দিকে,
ভালোবাসার নীরব অভিমানে।।

Sunday, 22 January 2023

বঙ্গ মায়ের বীর সন্তান

 বঙ্গমায়ের বীর সন্তান 

পারমিতা চ্যাটার্জি 


পরাধীন ভারতমাতার শৃঙ্খল উন্মচনে যখন উদভ্রান্ত চরমপন্থী ভারতের বিপ্লবী দল,

যখন তাদের সামনে একটাই দিশা ভারতমাতার মাটিতে পুঁততে হবে স্বাধীন ভারতের পতাকা, 

তখনই ঠিক তখনই ভেসে এলো এক দৃপ্ত কণ্ঠস্বর 

" তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো "। 

কে সেই মহান নেতা যাঁর বজ্র গম্ভীর কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিলো,এখন এসেছে সময়, অস্ত্রের বদলে অস্ত্র ধরার, 

হ্যাঁ তিনিই আমাদের নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ভারত তথা বঙ্গমায়ের বীর সন্তান আমাদের ঘরের ছেলে সুভাষ চন্দ্র বসু। 

আপোষহীন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সমস্ত শক্তি নিয়ে,

 তরুণ বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করলেন মায়ের হাতের শৃঙ্খল উন্মোচনে। 

দূর্বিনীত স্বৈরাচারী ইংরাজ শাসক বারবার অক্ষম  হয়েছে তাঁকে দাবিয়ে দিতে, 

কারাবন্দী জীবনের যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে আবার নতুন উদ্যমে উন্নত শিরে এগিয়ে গিয়েছেন লক্ষ্য  পূরণে। 

চোখে শুধু একটাই স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে, চাই স্বাধীনতা, " মানবেনা ভারতবাসী আর বিদেশি শক্তির অপশাসন "। 

অপারগ ইংরেজ সরকার তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখলেন, 

বন্দী থাকার মানুষ তো তিনি নন,

ছদ্মবেশে শাসকের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেলেন কাবুল আফগানিস্তান পেরিয়ে সুদূর বার্লিনে, 

সবাই যখন জানে সুভাষ চন্দ্র নিরুদ্দেশ, 

চতুর্দিকে তাঁর খোঁজ চলছে, 

বিপ্লব কি তাহলে ঝিমিয়ে যাবে! 

ঠিক তখনই বার্লিনের রেডিও থেকে ভেসে এলো, 

সেই পরিচিত দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, " আমি সুভাষ বলছি"। 

জার্মান থেকে সাবমেরিনে জাপানে এসে পৌঁছে 

গড়ে তুললেন বন্দী ভারতীয়দের নিয়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তাঁর সৈন্যদল, আজাদ হিন্দ ফৌজ। 

প্রবল শীত, অন্ধকার পাহাড়ের পথ, খাদ্য নেই, নেই বস্ত্র, 

আছে শুধু তাদের নেতার দেখানো স্বাধীন দেশের 

স্বপ্নের অঞ্জন চোখে, 

তাই নিয়ে এগিয়ে চলেছে বীর সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজের বাহিনী। 

আসতে আসতে তারা প্রায় চলে আসে ইম্ফলে,

তুলে ধরেন স্বাধীন ভারতের পতাকা, 

প্রায় দেশ স্বাধীনের মুখে, হঠাৎ এলো সেই ভয়ংকর খবর, নেই!  

আমাদের ভারত মায়ের বীর সন্তান নেতাজি সুভাষ আর নেই, 

তাঁর নাকি মৃত্যু হয়েছে, প্লেন ক্র্যাশেব!

এ যে মিথ্যা, নিদারুণ মিথ্যা, 

কোথায় গেলেন সুভাষ!  জানা গেলো সেদিন কোনো প্লেন ক্র্যাশ হয়নি, 

তাহলে!  এই তাহলে প্রশ্নের উত্তর আজও ভারতবাসীর কাছে অজানা, 

আজও ভারতবাসী জানেনা, ভারতের স্বাধীনতা যাঁর জন্য এসেছিল সেই বীর সুভাষ আর কোনদিন ফিরে আসেন, 

উত্তর দিতে পারেন নি, তদানিন্তন ভারতের রাষ্ট্রীয় নেতারা, 

না কি উত্তর দিতে চাননি, এ প্রশ্ন এখনও প্রশ্নই থেকে গেছে, 

শুধু জানি আমাদের বঙ্গমায়ের বীর সন্তান আার ফিরে আসেন নি। 

ভারতবাসীর হৃদয়ে আজও তিনি উজ্জল, আজও ২৩শে জানুয়ারি এলেই আপনি প্যারেডের তালে তালে পা চলে, " কদম কদম বাড়ায়ে যা, খুশিকে গীত গায়ে যা, ইয়ে জিন্দেগী কি কৌম কি, তু কৌম পর লুটায়ে যা "।।

Saturday, 21 January 2023

প্রথম প্রেম

 


প্রথম প্রেম

অনুগল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 



এখনও মনের কোণায় পড়ে আছে ফেলে আসা পথের শেষ রেখা খানি। বিশ্বাস কর অমিতাভ এখনও তোমাকে খুঁজি  তোমাদের সেই চতুষ্কোণ তিনতলার বারন্দায়। যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে আমাকে দেখার জন্য। আমাদের স্কুল বাসটা ওখান থেকেই আমাকে তুলতে আসতো। আবার যখন ফিরতা তখনও দেখতাম নির্নিমেষ তুমি দাঁড়িয়ে আছো সেই বারন্দায়। আমার অজান্তেই চোখ দুটো চলে যেতো রাস্তা থেকে একফালি তিনতলার বারন্দায় যেখানে একটি ছেলে তার ভালোবাসার দৃষ্টি  মেলে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো। সেদিন বাড়ির ভয় যে কথা বলতে পারিনি তা আজ জীবনের শেষবেলায় এসে খুব বলতে ইচ্ছে করছে। তুমি  জানোনা যে আমি ঘুরেফিরে আবার আমার সেই ছোট্ট বেলার পাড়ায় এসে ঘর বেঁধেছি। জানিনা তুমি এখনও ও বাড়িতে আছো কি না বা কোথায় আছো?  কেমন আছো? 

তৃষ্ণার্ত চোখে তাই যাতায়াতের পথে বাড়িটার দিকে চেয়ে তোমাকে খুঁজি। হয়তো অনেক বদলে গেছো তাই চিনতে পারিনা। হয়তো তুমিও আমার মতন দাদু হয়ে গেছো। সবটাই হয়তোতেই আটকে আছে। 

দেখা হলে একবার তোমাকে বলে যেতাম যে আমিও ভালো বেসেছিলাম। তাইতো জীবন সায়াহ্নে এসে তোমায় খুঁজি তোমার জায়গায়। কিন্তু পাইনা। জানিনা আদৌ কোনদিন পাবো কি না!  যেখানেই থাকো খুব ভালো থেকো আর পারলে মনে করার চেষ্টা কোরো, বারন্দায় দাঁড়িয়ে স্কুল যাতায়াতের সময় একটি মেয়ের অপেক্ষায় থাকতে শুধু তাকে একবার দেখবে বলে। সেই মেয়েটিও এখন প্রায় বৃদ্ধাই বলা চলে তবুও তার অবুঝ মন খুঁজে চলে প্রথম যৌবনের অসম্পূর্ণ প্রেমকে। 

Friday, 20 January 2023

জীবন ও ভালোবাসা

 জীবন ও ভালোবাসা

পারমিতা চ্যাটার্জী 


বসন্ত তোর মিঠে রোদখানা বড়ই মায়াময়,

আনাগোনা করছে মেঘ বৃষ্টির আড়াল দিয়ে,

মনের আয়নায় হাল্কা মেঘের খেলা,

মনের রোদে শুকোয় ভোরের ভেজা চুল, 

ইতিউতি ছড়িয়ে পলাশের লাল ছিটে।

অষ্টাদশীর লাল শাড়ীর আঁচল কোমরে জড়িয়ে,

কোথায় যায় কোন বসন্তের সুখ কুড়িয়ে নিতে?

চঞ্চল  নদীর ঝিরঝিরে ধারা আছড়ে  পড়ে

মল পড়া রাঙা পায়ের তলায়,

সন্ধ্যার চাঁদ বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে,

মুখ লুকোয় মায়াবী জোৎস্নার আড়ালে,

বসন্ত যে বড়ই চঞ্চল, 

শুধু আসা যাওয়ার খেলা খেলে যায়

মনের আনাচে কানাচে।

উন্মত্ত দক্ষিণা বাতাসের তাণ্ডবে

ঝরে পড়ে কৃষ্ণচূড়া ফুল,

পাতাবাহার সযত্নে মেলে ধরে নিজকে

সবুজের আঙিনায়,

কালকের রঙ ধূসর হবে বলে

আজ কেন সবুজ লুকিয়ে যাবে?

কালকে অষ্টাদশী কাঁদবে বলে

প্রেমের জোয়ারে  মনকে কেন

 ভাসাবে না আজ?

কাল অমাবস্যার আঁধারে

আকাশ ঢাকবে বলে

বসন্ত পূূণিমায় চাঁদ 

কেন হাসবেনা?

দুঃখ বেদনার মাঝে

ভালোবাসা কেন উকি দেবেনা?

জীবন ও ভালোবাসা

জড়িয়ে আছে একে অন্যকে

গভীর চেতনার বন্ধনে

জীবন যতদিন আছে

ভালোবাসাও তার হাত

ধরে  নীরবে চলে যায়।।

Thursday, 19 January 2023

মোহর

 বিভাগ- গল্প

শিরোনাম - মোহর

 কলমে-পারমিতা চ্যাটার্জী 


মোহর বিদেশ থেকে শাশুড়ি মাকে ফোন করলো-

- কেমন আছো মা? 

- এই আছি মা, চলে যাচ্ছে 

- আমি জানি মা তোমার খুব একা লাগে তাইনা?  

- হ্যাঁ রে একাকীত্ব বড়ো কষ্টকর,  সব থেকেও যেনো কিছু নেই, মাঝে মাঝে খুব অসহায় লাগে নিজেকে - 

- আর অসহায় লাগবেনা, আমার ওপর একটু ভরসা রাখো, আর সেই পুরানো সব সংস্কার থেকে তোমাকে আমি বের করে আনবোই। সব কর্তব্য তোমার হয়ে গেছে, এবার তোমাকে শুধু নিজের জন্য বাঁচতে হবে। 

- মা সামনের মাসে আমি আসছি তোমার কাছে, অনেকদিন তোমাকে দেখিনি, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, তুমি তো জানো সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, এখন মা বলতে তোমাকেই বুঝি। 

অন্নপূর্ণা দেবী জানেন এই মেয়েটি নামেই তার পুত্রবধূ, কিন্তু তার ভালোবাসা,কোন সন্তানের চেয়ে  কিছু কম নয়। 

তাঁর অন্তরের দুঃখ বেদনা, নিত্য স্বামীর অপমান সে নিজে চোখে দেখেছে, একমাত্র সেই রুখে দাঁড়িয়ে ছিল শ্বশুরের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। 

আঙুল উঁচু করে বলেছিল, " আর যদি কোনদিন দেখি আপনি আমার মামনিকে কোন অপমান করেছেন, তবে জেনে রাখবেন সেদিন আপনার কপালে অনেক দুঃখ আছে "। 

আধুনিক মেয়ে মোহরের তীব্র চোখের দৃষ্টির সামনে সেদিন মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়েছিল সেই লোকটা, যার নাম ছিল প্রদ্যোত, আজ তিন বছর হল তাকে সে মুক্তি দিয়েছে, কিন্তু একথা সত্যি যে তার মৃত্যুতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি অন্নপূর্ণাদেবীর বরং একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তার। 

সারাজীবন শিক্ষিতা স্বনির্ভর অন্নপূর্ণাকে সে মানুষিক তো বটেই শারীরিক অত্যাচারও কম করেনি। রাতগুলো ছিল বিভীষিকা, রিতীমত ধর্ষিত হতেন তিনি স্বামীর হাতে প্রতিরাতে, একবার বড়োছেলেকে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিলেন, " তোরা তো বড়ো হয়েছিস তাই বলছি, প্রতিরাতে তোর বাবার এ অত্যাচার আর তো আমি সহ্য করতে পারছিনা, " মায়ের ঘাড়ে দগদগে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট তখনও, সে তাড়াতাড়ি মায়ের ক্ষত জায়গায় ওষুধ লাগিয়ে দিল,তারপর মায়ের হাত ধরে বাপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, এটা কি?  নির্লিপ্ত উত্তর দিয়েছিল নির্লজ্জ লোকটা, আমি কি করবো? ওরকম সব মেয়েদেরই হয়, 

ছেলে রুখে দাঁড়িয়ে আবার বলেছিল, না সবার হয়না,তোমার মতন পশুর সাথে যাদের ঘর করতে হয় তাদেরই হয় -

বাবার চিত্কারকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল একবার গলা তুলে দেখ, তোমার জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে দেব,আর আজ থেকে মা আলাদা শোবে, এই নিয়ে তুমি যদি কোন গণ্ডগোল কর তাহলে তোমাকে আমি টানতে টানতে পুলিশের কাছে নিয়ে যাব। চিতকার চেঁচামেচিতে অন্য দুই ছেলেও এসে গেছে ছোট ছেলে তো মায়ের আঘাত দেখে উত্তেজিত হয়ে বাবাকে মারতে উঠেছিল, অন্য ভাইয়েরা থামিয়ে দিয়ে বললো ছেড়ে দে। 

সেই থেকে তার শোবার ঘর আলাদা,  বউমারা এসেও দেখেছে শাশুড়ি মায়ের  আলাদা শোবার ব্যাবস্থা। শ্বশুরের মুখে কুশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুনে আলাদা থাকার কারণ টা তারা বুঝে নিয়েছিল। 

মোহর শাশুড়ি মায়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, তাকে অনেক মনের কথা বলেছিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। 

সেই সময় মোহরকে বলে ফেলেছিলেন তার একান্ত মনের গোপন কথাটি। 

কলেজে পড়বার সময় তাঁর খুব ভালো লাগতো তাঁদের প্রফেসর অমলেন্দু নাগকে, বোধহয় তাঁরও ভালো লেগেছিল  স্বল্পভাষী মিষ্টি অন্নপূর্ণাকে,

সবাই বলতো স্যার তো একজনের মুখের দিকে চেয়েই লেকচার দিয়ে যান, আর কোনদিকে তাকান না। লজ্জা পেতেন তিনি সহপাঠীদের কথায়, কিন্তু এ কথা সত্যি যে তিনি তার দিকে তাকিয়ে পড়িয়ে যান। কিন্তু কেউ কোনদিন মনের কথা কাউকে বলেন নি। কলেজ শেষ হবার পর মার্কশীট আনতে যেদিন অন্নপূর্ণা কলেজে গেলেন সেদিন তিনি নিজেই স্যারের সাথে দেখা করতে গেলেন, স্যারের ঘরে তখন নতুন ভর্তির জন্য বেশ কিছু লোকজন ছিল, তাকে দেখে তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলে তিনি বাইরে এসে বলেন," আমি জানতাম তুমি আসবে ", 

অন্নপূর্ণা মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন লজ্জায়। তিনি ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, একটু বাইরে অপেক্ষা করতে পারবে?  আমি এই কাজটা সেরেই আসছি -

অন্নপূর্ণা মাথা নামিয়েই সম্মতিসূচক ঘাড়া নেড়ে বাইরে আসেন।  

একটু পরেই উনি বেরিয়ে এলেন, বললেন চল-

অন্নপূর্ণার ইচ্ছে থাকলেও জিজ্ঞেস করতে পারলেননা কোথায়!  নীরবে অনুসরণ করে চলতে লাগলেন। একটু পরেই একটা কফিশপে দুজনে বসলেন, তারপর উনি খুব ধীর স্থির গলায় বললেন, বহুদিন থেকেই একটা কথা তোমাকে বলতে চাইছিলাম কিন্তু বলতে পারিনি, আজ তোমার কলেজ জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, আজ আর না বললে আর হয়তো বলাই হবেনা তাই তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম-

- অন্নপূর্ণা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন - উনি বললেন, কলজে যখন তোমার মুখের দিকে চেয়ে পড়াতাম, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে তুমি আমাকে একটু অন্য ভাবে পছন্দ কর,মানে আমার প্রতি একটা ভালোলাগা তোমার মধ্যে কাজ করে- কি আমি ঠিক বলছি তো?

অন্নপূর্ণা তখন রীতিমতো ঘামতে শুরু করে দিয়েছেন, কোনরকমে মুখ নামিয়ে বললেন, হ্যাঁ -

- তিনি তখন বললেন - ব্যাস আমি এই উত্তর টার জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম, আচ্ছা!  তুমি কি বুঝতে পেরেছিলে যে আমিও তোমাকে খুব পছন্দ করি - 

অন্নপূর্ণা এবার একটু মুখ তুলে বলেছিলেন, আন্দাজ করেছিলাম, তাইতো আজ সাহসে ভর করে আপনার ঘরে এসেছিলাম, যদি কিছু বলেন তাই -

- তিনি হেসে ফেলে বললেন, যতোটা ভালোমেয়ে ভেবেছিলাম ততোটা মোটেই নয় তাহলে দেখছি, বলেই হেসে উঠেছিলেন আর অন্নপূর্ণাও ওর টোল ফেলা গাল নিয়ে হেসে ফেলেছিলেন। 

তারপর ওরা আরও দুচারদিন দেখা করেছিলেন, দুজনে মনের কাছাকাছি এসেছিলেন। 

প্রায় একমাস ঘোরাঘুরির পর একদিন গঙ্গার ধারে তার হাতটা ধরে বলেছিলেন, তুমিতো এম এ পাশ করে এমফিল করবে?  

- হ্যাঁ সেই রকমই তো ইচ্ছে আছে -

- ইচ্ছে আছে না করতেই হবে - আর তার সাথে আর একটা জিনিসও করতে হবে-

-কি? 

- অপেক্ষা - পারবেনা আমার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে?  আমি একটা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছি পোস্ট ডক্টরেটের জন্য, পাঁচটা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে,তুমি পারলে পি এইচ ডি আরম্ভ করে দিও, আমি নিয়মিত তোমাকে নোটস পাঠাবো, চিঠিও লিখবো, দেখবে ঠিক সময় কেটে যাবে - 

- তিনি বলেছিলেন করতেই হবে, এখন তো আর কোন রাস্তা নেই, ভালোবেসেছি যে-

- তিনি মৃদু হেসে সেদিন অন্নপূর্ণার মাথাটা বুকের কাছে টেনে এনে তার কপালে একটা আলতো চুম্বন দিয়ে বলেছিলেন, ভালোবাসার অপেক্ষা খুব মধুর হয়-। 

কিন্তু এমনই ভাগ্য যে এমফিল শেষ হবার সাথে সাথেই বাবার ক্যান্সার ধরা পড়লো,তারা ধনে প্রাণে শেষ প্রায় শেষ হয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে তাকে কলেজের চাকরি নিতে হল, পি এইচ ডি করা আর হল না। ভেবেছিলেন একটু সামলে নিয়ে পি এইচ ডি আরম্ভ করবেন। তাদের বসতবাড়িও বাধা পড়েছিল বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে, বাধ্য হয়ে তাদের তিন ভাই বোন বোন সমেত মাকে কাকার বাড়ি আশ্রয় নিতে হয়েছিল। 

তখন কলেজের মাইনে এতো বেশি ছিলোনা, তাই দুই ভাইবোনের পড়া আর টিউশনির খরচ দিয়ে কাকার হাতে খুব কম টাকাই দিতে পারতেন, এতে কাকা কাকীমার অসন্তোষ টের পাচ্ছিলেন, তখন একাধিক টিউশন নিয়ে সাংসারিক ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছিল, তাতেও শান্তি ছিলোনা। এরকম অবস্থায় একদিন হঠাৎ জানতে পারে কাকা তার বিয়ে ঠিক করেছে, মায়ের কান্না, তার অনেক অনুনয় বিষয়কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মূর্খ কিন্তু কিসব চামড়ার ব্যাবসা করে প্রদ্যোতের সাথে তার বিয়ে দিয়ে জীবনের চিত্রটাকে কাকা পুরো বদলে দিয়েছিল। অমলেন্দুকে সবই খুলে লিখেছিলেন তিনি তার অক্ষমতার কথা, অমলেন্দু চিঠিতে জানিয়েছিল আর একটু আগে কেন জানালেনা-?

আমি চলে আসতাম - 

- তিনি উত্তরে দিয়েছিলেন, মাত্র সাতদিন আগে তাকে জানানো হয়েছিল তার বিয়ের কথা, তখুনি চিঠি দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে যখন চিঠি পৌছেছে তখন আমার যা হবার তা হয়ে গিয়েছে। 

একমাত্র মোহরকেই এসমস্ত কথা তিনি বলেছিলেন,  মোহর ছয়মাসের ছুটি নিয়ে এলো - অন্নপূর্ণা দেবী আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে, তুই এতোদিন থাকবি আমার কাছে- 

- হ্যাঁ মা জীবনে অনেক কষ্ট করেছ, আর নয় এবার তোমার একটা ব্যাবস্থা করবো বলেই এসেছি -

- কি ব্যবস্থা -?

- সেটা সারপ্রাইজ থাক-। 

মোহর অমলেন্দুর সাথে যোগাযোগ করে শহর থেকে একটু দূরে একটি বিরাট বাড়ি কেনা হয়েছিল, অমলেন্দুই কিনেছেন, মোহর বহুদিন থেকে তাঁর সাথে যোগাযোগ করে এই ব্যবস্থা করেছিল, বাড়িটি হয়েছিল বৃদ্ধাশ্রম, শ্রীরামপরে একদম গঙ্গার বক্ষে বাড়িটি ছিল, সেখানে ডাক্তার, হোম কিচেন সব ছিল, একটা ঘরওলা ছোট ফ্ল্যাট আবার দুটো ঘরওলা ফ্ল্যাটও ছিল, বাড়ির সামনে ফুলের বাগান, পিছনে একটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন  সাজানো ঝিলকে ঘিরে সব্জির বাগান। অমলেন্দু তার নিজের জন্য দুই ঘরওলা একটা ফ্ল্যাট রেখেছিলেন, বাকি সব ফ্ল্যাট গুলোই ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির বাইরে বড়ো বড়ো করে একটি শ্বেতপাথরের প্লেটের ওপর লেখা ছিল অন্নপূর্ণা বৃদ্ধাশ্রম। 

এসব কথা অন্নপূর্ণা কিছুই জানতেন না। 

কিছুদিন পর মোহর তাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে বললো, চল আমার সাথে একটু বেরোতে হবে, 

কোথায় রে?

গেলেই দেখতে পাবে -। 

যাবার পথে মোহর গাড়ি থেকে নেমে কিসব কিনলো যেনো, তিনি দেখলেন দুটো বড়ো ফুলের গোড়ের মালা দু তিনটি বিরাট বাক্স ভর্তি করে মিষ্টি, 

- তোর মতলব টা কি বলতো? কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে? 

- উফ্ বড়ো কথা বল তুমি, চল তো চুপচাপ। 

এরপর তো আরও অবাক হবার পালা, একটি রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে দাঁড়ালেন দুজনে, দেখলেন অমলেন্দু বেরিয়ে এলেন ধুতি পান্জাবী পরে। পরের ঘটনা তো আর বলার দরকার নেই। 

সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের সবাই খুব আনন্দ করলো, অমলেন্দু সবার জন্য ছোট করে খাওয়ার আয়োজন করেছিলেন, তার সাথে মোহরের আনা মিষ্টি, মায়ের জন্য একটা সাদার ওপর লাল পার দেওয়া বেনারসি, আর অমলেন্দুর গরদের পান্জাবী আর ধুতি। ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললো এই নাও মেয়ের বাড়ি থেকে আনা ফুলশয্যার তত্ত্ব। 

অন্নপূর্ণা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললেন তুই পেটে পেটে এতো কিছু করেছিস, আমাকে কিছু জানতে দিস নি -

- আমি তো কিছু করিনি মা শুধু দুটো বহুদিন ধরে অপেক্ষাকৃত হৃদয়কে মিলিয়ে দিয়েছি, যা তোমার পাওনা ছিল আমি তাই করেছি শুধু এই বৃদ্ধাশ্রমে। 

কাকুর কাছে যখন শুনলাম কাকু তোমার নামে এই বৃদ্ধাশ্রম করেছেন আর তিনিও একা কাউকে বিয়ে করতে পারেননি শুধু তোমাকে ভালোবেসে ছিলেন বলে, আমি এই বৃদ্ধাশ্রমে দুটি ভালোবাসাকে এক করে দিলাম শুধু। 

রাত্রি এলো,অমলেন্দু পরিপূর্ণ ভাবে তাকালেন তার যৌবনের ভালোবাসায় দিকে-তারপর দুহাত বাড়িয়ে দিলেন, 

অন্নপূর্ণা ধরা দিল সেই বহু প্রতিক্ষিত বাহুবন্ধনে। 

এতদিনের অপূর্ণ ভালোবাসা মুক্তি পেল অবশেষে বৃদ্ধাশ্রমের একটি স্বল্প পরিসর ফ্ল্যাটে।

Wednesday, 18 January 2023

মনকলি উপন্যাস ১মপর্ব

 পর্ব -১

বড়ো গল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 

১৯/১১/২০


জীবনের রঙ মাঝে মাঝে বদলে যায়। যে সুখের স্বপ্ন নিয়ে একদিন ঘর বেঁধেছিল মনকলি, সে ঘর তার ভেঙে গেছে। 

নিজেকে বড়ো দামী মনে করতো মনকলি। বাবা মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে, পড়াশোনায় খুবই মেধাবী সেই সাথে অসাধারণ গানের গলা। পাড়ার ফাংশনে তার গান, সংলাপ থাকবেই। তার সাথে গান গাইতো একটি মারোয়ারী ছেলে, কিন্তু অসম্ভব রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, বারবার কি যেনো এক অমোঘ টানে ছুটে যেতো শান্তিনিকেতন, ছেলেটির নাম ছিলো রাজকুমার, সবাই তাকে ডাকতো বউয়া বলে। মনকলিও তাকে বউয়াদা বলেই সম্বোধন করতো। আর মনকলিকে সবাই তার বাড়ির নাম অর্থাৎ মিতুল বলে ডাকতো। মিতুলের চেহারা খুবই ফুটফুটে, টকটকে ফর্সা রঙ,একঢাল চুল,দুটি বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখ, অনেকেই তাকে ভিষণ পছন্দ করতো কিন্তু বউয়াদা যে তাকে নিজের মনে এক গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছিল তা সে জানতেই পারেনি। 

কথায় আছে সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও অবহেলা করতে নেই।

গুণ এবং রূপের এক প্রচ্ছন্ন অহংকার মনকলির মনকে কখন যেনো ঘিরে ধরেছিলো। বাড়িতেও সবার খুব আদরের ছিলো, মাসি পিসিরা বলতো এই মেয়ের জন্য আইপি এস, বা উচ্চপর্যায়ের কোনো পরিবারের সুপুরুষ ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে। শুধু বাবা বলতেন এখন ওসব আলোচনায় কান না দিয়ে নিজের পড়াশোনা টাই মন দিয়ে করে পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করে গড়ে তোল।রূপ দুদিনের, তারপর সব একঘেয়ে হয়ে যায় কিন্তু তোমার বিদ্যা, তোমার গান, তোমার জীবনের মূলমন্ত্র। আর একটা কথা যদি কখনও কাউকে ভালোবাসো তবে তার রূপ বা অর্থ দেখোনা, শুধু দেখো মানুষ টা যেনো প্রকৃতরূপে একজন মানুষ হয়। 

বাবার কথা সে অনেকটা মেনেছিলো কিন্তু সবটা মানতে পারেনি তাই হয়তো জীবনের এক পরম দুর্যোগের সামনে পড়তে হলো। 

ইতিহাসে ফাস্ট ক্লাস নিয়ে মাস্টার্স করে নেট পরীক্ষায় উত্তির্ন হল, পি এইচ ডি করতে করতেই সরকারি কলেজের লেকচারার হয়ে গেলো, তার সাথে চললো পুরো দমে গানের চর্চা। 

একসময় সে যখন এম এ ক্লাসে ভর্তি হয়েছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, তখন বউদা মাস্টার্স শেষ করে নেট দেবে কিনা ভাবছে, তার ইচ্ছে ছিলো বাকি পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে গিয়ে করার কিন্তু মনকলিকে ছেড়ে হয়তো যেতে পারছিলোনা। বউয়াদার রেজাল্ট সাধারণ মানের  সেকেন্ড ক্লাস ছিলো, দেখতেও সাধারণ ছিলো, গায়ের রং শ্যামলা, লম্বা দোহারা চেহারা, চোখ দুটি বড়ো সুন্দর আর গভীর ছিলো, কিন্তু কোনভাবেই তাকে সুপুরুষ বলা যায়না। 

এই বউয়াদা যখন তাকে ভালোবাসার কথা জানালো সে অত্যন্ত অহংকারী মনোভাব নিয়ে বললো, হ্যাঁ তোমার সাথে আমি গান গাই, ভালো ভদ্র ছেলে বলে মানি তাবলে কোনভাবেই তোমাকে আমার প্রেমিক বা জীবনের ভালোবাসা  বলে ভাবতেই পারিনা। তুমি তো আমার যোগ্য নও তাহলে এ প্রস্তাব নিয়ে কেনো এলে?  

বউয়াদা মুখটা কালো করে বললো সত্যি রে বড়ো ভুল হয়ে গেছে, আর কোনদিন তোর সামনে আসবোনা, আমায় ক্ষমা করে দিস। 

সত্যি এরপর থেকে কেউ তাকে আর পাড়ায় দেখতে পায়নি। পাড়ার ছেলেদের কাছে এবং অনেক মেয়েদের কাছেও সে খুব প্রিয় ছিলো, তার সাদাসিধে সুন্দর মিষ্টি ব্যবহারের জন্য। 

ওর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো বউয়দা শান্তিনিকেতনে চলে গেছে, ওখানে ওর কর্মজীবন শুরু করবে বলে। 

আজ মনকলি জীবন যুদ্ধে বিধ্বস্ত, আজ মনে হচ্ছে বউয়া দাকে তার বড়ো প্রয়োজন, কিন্তু কোথায় পাবে তাকে!  বাবার এই একটা কথাই সে অমান্য করেছিল , সাময়িক রূপ আর চাকচিক্যে ভুলে গিয়ে প্রবীরের হাত ধরেছিল পরম নির্ভয়ে, প্রবীর ছিলো বাইরে থেকে ডক্টরেট হয়ে আসা ছেলে, নটিংহ্যাম এ লেকচারার ছিলো, সে সব ভুলে প্রবীরের হাত ধরলো, এখানে প্রবীর কি করে বা ভবিষ্যতে ইউকেতে ফিরে যাবে কিনা সে বিষয়ে জানতেই চাইলোনা। 

এখানেই হল তার চরম পরাজয়। প্রবীর যে তার প্রতি  কর্তব্য করতোনা তা কিন্তু নয়। অনেক ভালোবাসা একএক সময় দেখাতো। মাঝে মাঝেই দামী উপহার নিয়ে আসতো। নিজের জন্মদিন আর বিয়ের তারিখ  খুব ঘটা করে পালন করতো। যখন মহিলা বান্ধবীদের মধ্যে থাকতো তখনই সে স্ত্রী কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, বান্ধবীদের সামনে স্ত্রী কে অপমান করে যেনো এক পৈশাচিক আনন্দ পেতো। আসতে আসতে মনকলি বুঝতে পারে সে ভুল করেছে, তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর ঠিক তখনই রোগের উপসম গুলো দেখা দিতে থাকে। একবার অপারেশন করতে হয় তখনই ধরা পরে রোগটা। এরপর সে ঠিক করে আর এখানে থাকবেনা সে বদলি নিয়ে চলে যাবে। 

কলকাতায় নানা লোকের প্রশ্ন ও কৌতুহল এড়াতে সে বদলি নিয়ে চলে এলো পুরুলিয়ায়। প্রবীরের প্রবীর বারমুখী হলেও অসুখের সময় সাধ্যমতো চিকিৎসা করিয়েছিল।সেও তখন ভাবতে পারেনি যে মনকলি তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যখন মনকলি জানালো তখন সে বললো এইসময় এই অবস্থায় তোমাকে কি করে একটা অজানা শহরে ছেড়ে দি আর ওখানে চিকিৎসা পাবে কি করে?  ঠাণ্ডা গলায় মনকলি বলেছিল, আমার জন্য আর নাই বা ভাবলে আমি মিউচুয়াল ডিভোর্স নেবো তোমার কাছে কোনো কিছু দাবী করবোনা শুধু ডিভোর্স টা দিয়ে দিও। উত্তরে প্রবীর বলেছিল, আমাকে তুমি যতোটা অমানুষ ভাবো আমি কিন্তু তা নই। তোমার চিকিৎসার জন্য আমি অনেক জায়গায় কথা বলেছি দরকার হলে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্লিজ এতবড়ো একটা অসুখ নিয়ে পুরুলিয়ায় চলে যেওনা। কিন্তু মনকলি চলে এসেছিল। যে ব্যাবহার সে এতদিন পেয়ে এসেছে তার সাথে মেলাতে পারছিলনা, তার কাছে সবটাই অভিনয় বলে মনে হয়েছে। 

পুরুলিয়ার নিস্তব্ধ বেলাভূমিতে চলে এলো, বলরাম পুর কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপিকা হয়ে এলো। 

বলরামপুরের একদিকে অযোধ্যা পাহাড় আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঘমুন্ডি শহর। বাঘমুন্ডি ছৌ নাচের জন্য বিখ্যাত। শৈশব থেকেই সে ছৌ নাচের খুব ভক্ত ছিল, ইচ্ছে আছে অধ্যাপনার সাথে সাথে ছৌ নাচের ওপর কিছু কাজ করার। রাঙামাটির কোলে লাল পলাশের বনে এসে এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ লাগলো তার মনে। অনেকটা যেনো তাকে শান্তিনিকেতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। 

বারবার অতীতের ভুলের কথা ভুলতে চেষ্টা করছে, না না প্রবীরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে বেঁচে গেছে শুধু নয় নিজের অহংকার দম্ভ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। এটুকু শিক্ষা তার হয়েছে বাইরের কোনো চাকচিক্য নয় মানুষকে বিচার করতে হয় তার অন্তরের সত্তা দিয়ে। বউয়াদার বাবারও কিন্তু অনেক পয়সা, বিরাটকায় লাল বাড়িটার ছবি এখনও তার চোখে ভাসে। আসা যাওয়ার পথের ধারেই বাড়িটা পড়তো, ওই বাড়িরই একটা চারচৌকো গ্রীল দেওয়া বারান্দায়  সে দাঁড়িয়ে থাকতো কবে থেকে। যখন সে স্কুল থেকে ফিরতো তখন দেখতো ওই বারান্দায় তার আসার পথের দিকে চেয়ে বউয়া দা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কলেজ থেকে ফেরার সময় ওই একই দৃশ্যপট। মাঝে মাঝে মনে হত পড়াশোনা করে কখন?  কিন্তু তার সব পড়াশোনা আর ভালোবাসা যে রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করেই ছিলো তা সেদিন সে বুঝতে পারেনি। 

একদিন রিহার্সালের সময় কথায় কথায় বলেছিলো, আমার বাড়ির লোক ভাবে আমি পাগল, কি করে এই গান আর বাংলা নিয়ে আমি এতো মাতামাতি করি, কিন্তু আমি কি করবো বল!  রবীন্দ্রনাথ যে আমার হৃদয়ের তন্ত্রে তন্ত্রে বয়ে চলেছে,তাঁর গানের অসাধারণ ফিলোসোফি আমাকে মুগ্ধ করে আর সেই টানেই মনে হয় চলে যাই কবির শিক্ষা নিকেতনে বিশ্বভারতীতে, 

অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা তুমি বাংলা এতো ভালো করে বুঝতে পারো কি করে?  

ম্লান হেসে সে উত্তর দিয়েছিল, আমার মায়ের কাছ থেকে, মা যে বিশ্বভারতীর ছাত্রী ছিলেন, 

তাইনাকি!  উনি কি বাঙালি? 

না, তবে কর্মসূত্রে আমার দাদুর পোস্টিং ছিলো বোলপুরে, পরবর্তী কালে দাদু বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিক্স পড়াতেন, আর আসাতে আসতে রবীন্দ্রনাথ কে জানতে চেষ্টা করেন, বুঝতে চেষ্টা করেন, নিজের অজান্তেই দাদু কখন যনো প্রবল রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে পড়েন। 

তারপর? 

তারপর আর কি, কোন এক পৌষমেলায় এসে মায়ের সাথে বাবার পরিচয় হয়, মায়ের টানেই বাবা বারবার ছুটে যেতেন শান্তিনিকেতনে, একসময় ওদের বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু এতো ভালোবেসে বিয়ে করেও মাকে বাবা তাঁর যোগ্য মর্যাদা কখনও দিতে পারেননি। 

আমি হওয়ার পর শেষ কটা বছর মা দাদুর কাছেই থেকে গিয়েছিলেন, ওখানেই একটা ছোটো স্কুলে পড়াতেন আর মন ভরে গান গাইতেন, আমিও মায়ের সাথে থেকে থেকে ওই একই দিকে মন পড়ে থাকলো, আজও তার থেকে বার হতে পারলাম না। বাবা শুধু বলতেন যে আমি যা ভালোবাসি তাই যেনো করি, তখন হয়তো মায়ের কথা ভেবেই বলতেন, মা যে ওতো তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তা বাবা বুঝতেই পারেন নি। মায়ের মৃত্যু বাবা মেনে নিতে পারেননি খুব ভেঙে পড়েছিলেন আর আমাকে আঁকড়ে থাকেন  এখন, আমার মধ্যে দিয়েই মাকে খোঁজেন হয়তো। 

মনকলিকে এ কথাগুলো খুব গভীর ভাবে স্পর্শ করলেও ভালোবাসা বা টান কোনদিন অনুভব করেনি। আজ কিন্তু বউয়াদার মতন মানুষকেই ফিরে পাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। 

কিন্তু কোথায় তাকে পাবে জানেনা। এখানে আসার আগে গিয়েছিল সে শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে খোঁজ করে জানতে পারে বউয়াদা পুরুলিয়ার কোনো কলেজের প্রফেসর হয়ে চলে এসেছে। সত্যি কথা বলতে সেও একই আশায় এখানে এসেছে যদি সে খুঁজে পায় তার পুরানো বউয়াদাকে, যে তাকে পাগলের মতন ভালোবাসতো, তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েই সে চলে এসেছিল, একরকম নিজেকে একলা করে শুধু নিজের কাজ করে গেছে শান্তিনিকেতনের নিরালা নিভৃত কোণে। ওখানে তার সাথে দেখা হয়েছিল তার পুরানো বন্ধু সুচরিতার সাথে, সুচরিতাও পড়ায় বিশ্বভারতীতে, সুচরিতার মুখেই শুনেছিল বউয়দা ফিলোসোফি তে ডক্টরেট করেছে, রবীন্দ্র দর্শনের ওপরই সে থিসিস লেখে যা বিপুল ভাবে সর্বত্র সমাদৃত হয়।  মাঝখানে দুবছর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল ইউরোপের ফিলোসফারদের ওপর কাজ করতে, তাদের দর্শন নিয়ে নানা তথ্য আলোচনা ও রিসার্চ করে,বিদেশের অনেক বড়ো বড়ো ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ানোর অফার পেয়েও নেয়নি, সুচরিতার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল আমার শিক্ষা আমি আমার দেশের ছেলেমেয়েদের দেবো, বিদেশের কোনো মোহ আমার নেই। 

সুচরিতার সাথে দুদিন ছিল তখন অনেক কথাই হয়েছিল। সুচরিতা বলেছিল আমি বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিলাম রে মানুষটাকে, 

কোনদিন বলিস নি? 

- হ্যাঁ রে বলেছিলাম, 

- কি বললো? 

- কবির কবিতায় উত্তর দিলো, " ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো এ তরী "। 

তোমাকে দেওয়ার মতন আমার কিছু আর নেই সুচরিতা, আমি নিশ্ব, সব কিছু একজনকে দিয়েই নিশ্ব হয়ে বসে আছি। শুধু শুধু তোমাকে ডেকে এনে অসম্মান করতে পারবোনা, আমাকে ক্ষমা করো। 

তারপরই পুরুলিয়ায় চলে যায়, যাবার আগে আমার সাথে দেখা করে বলে যায়, ভালো থেকো সুচরিতা, খুব ভালো থেকো, শুধু শুধু কষ্ট পেয়োনা, আমি জানি প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা বড়ো মর্মান্তিক, আমি চাইনা আমার জন্য কেউ এ কষ্ট পাক, মনে কোরো ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলে, নতুন করে বাঁচতে হবে তোমাকে, তোমার জন্য অনেকে হাত বাড়িয়ে দেবে, আমার শুভকামনা তোমার সাথে সবসময় থাকবে, যেদিন জীবনের পরিপূর্ণতায় ভরপুর হয়ে যাবে সেদিন এই দাদাটার কাছে এসো কেমন!  আজ আমি যাই। 

তারপরও সুচরিতা বলে যেতে লাগলো অনেক জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন কলেজ, কি ঠিকানা?  ম্লান হেসে উত্তর দিলো, আমি যে নিজেই জানিনা কোথায় হবে আমার ঠিকানা!  ঠিকানাবিহীন পথে চলে চলেই তো আমি অভ্যস্ত, পেয়ে যাবো কোন একটা ঠিকানা, 

- তাহলে কি করে জানলি বউয়াদা পুরুলিয়ায় গেছে? 

- এক কলিগের মুখে শুনেছিলাম পুরুলিয়ার কোন একটা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছে। 

সেই কথা শোনার পরে সে এক অসীম আশায় ভর করে পুরুলিয়ায় এসেছে। 

ক্রমশ


মনকলি উপন্যাস। প্রথম পর্ব

 পর্ব -১

বড়ো গল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 



জীবনের রঙ মাঝে মাঝে বদলে যায়। যে সুখের স্বপ্ন নিয়ে একদিন ঘর বেঁধেছিল মনকলি, সে ঘর তার ভেঙে গেছে। 

নিজেকে বড়ো দামী মনে করতো মনকলি। বাবা মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে, পড়াশোনায় খুবই মেধাবী সেই সাথে অসাধারণ গানের গলা। পাড়ার ফাংশনে তার গান, সংলাপ থাকবেই। তার সাথে গান গাইতো একটি মারোয়ারী ছেলে, কিন্তু অসম্ভব রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, বারবার কি যেনো এক অমোঘ টানে ছুটে যেতো শান্তিনিকেতন, ছেলেটির নাম ছিলো রাজকুমার, সবাই তাকে ডাকতো বউয়া বলে। মনকলিও তাকে বউয়াদা বলেই সম্বোধন করতো। আর মনকলিকে সবাই তার বাড়ির নাম অর্থাৎ মিতুল বলে ডাকতো। মিতুলের চেহারা খুবই ফুটফুটে, টকটকে ফর্সা রঙ,একঢাল চুল,দুটি বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখ, অনেকেই তাকে ভিষণ পছন্দ করতো কিন্তু বউয়াদা যে তাকে নিজের মনে এক গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছিল তা সে জানতেই পারেনি। 

কথায় আছে সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও অবহেলা করতে নেই।

গুণ এবং রূপের এক প্রচ্ছন্ন অহংকার মনকলির মনকে কখন যেনো ঘিরে ধরেছিলো। বাড়িতেও সবার খুব আদরের ছিলো, মাসি পিসিরা বলতো এই মেয়ের জন্য আইপি এস, বা উচ্চপর্যায়ের কোনো পরিবারের সুপুরুষ ছেলের সাথে বিয়ে দিতে হবে। শুধু বাবা বলতেন এখন ওসব আলোচনায় কান না দিয়ে নিজের পড়াশোনা টাই মন দিয়ে করে পায়ের তলার মাটিটা শক্ত করে গড়ে তোল।রূপ দুদিনের, তারপর সব একঘেয়ে হয়ে যায় কিন্তু তোমার বিদ্যা, তোমার গান, তোমার জীবনের মূলমন্ত্র। আর একটা কথা যদি কখনও কাউকে ভালোবাসো তবে তার রূপ বা অর্থ দেখোনা, শুধু দেখো মানুষ টা যেনো প্রকৃতরূপে একজন মানুষ হয়। 

বাবার কথা সে অনেকটা মেনেছিলো কিন্তু সবটা মানতে পারেনি তাই হয়তো জীবনের এক পরম দুর্যোগের সামনে পড়তে হলো। 

ইতিহাসে ফাস্ট ক্লাস নিয়ে মাস্টার্স করে নেট পরীক্ষায় উত্তির্ন হল, পি এইচ ডি করতে করতেই সরকারি কলেজের লেকচারার হয়ে গেলো, তার সাথে চললো পুরো দমে গানের চর্চা। 

একসময় সে যখন এম এ ক্লাসে ভর্তি হয়েছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, তখন বউদা মাস্টার্স শেষ করে নেট দেবে কিনা ভাবছে, তার ইচ্ছে ছিলো বাকি পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে গিয়ে করার কিন্তু মনকলিকে ছেড়ে হয়তো যেতে পারছিলোনা। বউয়াদার রেজাল্ট সাধারণ মানের  সেকেন্ড ক্লাস ছিলো, দেখতেও সাধারণ ছিলো, গায়ের রং শ্যামলা, লম্বা দোহারা চেহারা, চোখ দুটি বড়ো সুন্দর আর গভীর ছিলো, কিন্তু কোনভাবেই তাকে সুপুরুষ বলা যায়না। 

এই বউয়াদা যখন তাকে ভালোবাসার কথা জানালো সে অত্যন্ত অহংকারী মনোভাব নিয়ে বললো, হ্যাঁ তোমার সাথে আমি গান গাই, ভালো ভদ্র ছেলে বলে মানি তাবলে কোনভাবেই তোমাকে আমার প্রেমিক বা জীবনের ভালোবাসা  বলে ভাবতেই পারিনা। তুমি তো আমার যোগ্য নও তাহলে এ প্রস্তাব নিয়ে কেনো এলে?  

বউয়াদা মুখটা কালো করে বললো সত্যি রে বড়ো ভুল হয়ে গেছে, আর কোনদিন তোর সামনে আসবোনা, আমায় ক্ষমা করে দিস। 

সত্যি এরপর থেকে কেউ তাকে আর পাড়ায় দেখতে পায়নি। পাড়ার ছেলেদের কাছে এবং অনেক মেয়েদের কাছেও সে খুব প্রিয় ছিলো, তার সাদাসিধে সুন্দর মিষ্টি ব্যবহারের জন্য। 

ওর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেলো বউয়দা শান্তিনিকেতনে চলে গেছে, ওখানে ওর কর্মজীবন শুরু করবে বলে। 

আজ মনকলি জীবন যুদ্ধে বিধ্বস্ত, আজ মনে হচ্ছে বউয়া দাকে তার বড়ো প্রয়োজন, কিন্তু কোথায় পাবে তাকে!  বাবার এই একটা কথাই সে অমান্য করেছিল , সাময়িক রূপ আর চাকচিক্যে ভুলে গিয়ে প্রবীরের হাত ধরেছিল পরম নির্ভয়ে, প্রবীর ছিলো বাইরে থেকে ডক্টরেট হয়ে আসা ছেলে, নটিংহ্যাম এ লেকচারার ছিলো, সে সব ভুলে প্রবীরের হাত ধরলো, এখানে প্রবীর কি করে বা ভবিষ্যতে ইউকেতে ফিরে যাবে কিনা সে বিষয়ে জানতেই চাইলোনা। 

এখানেই হল তার চরম পরাজয়। প্রবীর যে তার প্রতি  কর্তব্য করতোনা তা কিন্তু নয়। অনেক ভালোবাসা একএক সময় দেখাতো। মাঝে মাঝেই দামী উপহার নিয়ে আসতো। নিজের জন্মদিন আর বিয়ের তারিখ  খুব ঘটা করে পালন করতো। যখন মহিলা বান্ধবীদের মধ্যে থাকতো তখনই সে স্ত্রী কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, বান্ধবীদের সামনে স্ত্রী কে অপমান করে যেনো এক পৈশাচিক আনন্দ পেতো। আসতে আসতে মনকলি বুঝতে পারে সে ভুল করেছে, তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর ঠিক তখনই রোগের উপসম গুলো দেখা দিতে থাকে। একবার অপারেশন করতে হয় তখনই ধরা পরে রোগটা। এরপর সে ঠিক করে আর এখানে থাকবেনা সে বদলি নিয়ে চলে যাবে। 

কলকাতায় নানা লোকের প্রশ্ন ও কৌতুহল এড়াতে সে বদলি নিয়ে চলে এলো পুরুলিয়ায়। প্রবীরের প্রবীর বারমুখী হলেও অসুখের সময় সাধ্যমতো চিকিৎসা করিয়েছিল।সেও তখন ভাবতে পারেনি যে মনকলি তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যখন মনকলি জানালো তখন সে বললো এইসময় এই অবস্থায় তোমাকে কি করে একটা অজানা শহরে ছেড়ে দি আর ওখানে চিকিৎসা পাবে কি করে?  ঠাণ্ডা গলায় মনকলি বলেছিল, আমার জন্য আর নাই বা ভাবলে আমি মিউচুয়াল ডিভোর্স নেবো তোমার কাছে কোনো কিছু দাবী করবোনা শুধু ডিভোর্স টা দিয়ে দিও। উত্তরে প্রবীর বলেছিল, আমাকে তুমি যতোটা অমানুষ ভাবো আমি কিন্তু তা নই। তোমার চিকিৎসার জন্য আমি অনেক জায়গায় কথা বলেছি দরকার হলে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্লিজ এতবড়ো একটা অসুখ নিয়ে পুরুলিয়ায় চলে যেওনা। কিন্তু মনকলি চলে এসেছিল। যে ব্যাবহার সে এতদিন পেয়ে এসেছে তার সাথে মেলাতে পারছিলনা, তার কাছে সবটাই অভিনয় বলে মনে হয়েছে। 

পুরুলিয়ার নিস্তব্ধ বেলাভূমিতে চলে এলো, বলরাম পুর কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপিকা হয়ে এলো। 

বলরামপুরের একদিকে অযোধ্যা পাহাড় আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঘমুন্ডি শহর। বাঘমুন্ডি ছৌ নাচের জন্য বিখ্যাত। শৈশব থেকেই সে ছৌ নাচের খুব ভক্ত ছিল, ইচ্ছে আছে অধ্যাপনার সাথে সাথে ছৌ নাচের ওপর কিছু কাজ করার। রাঙামাটির কোলে লাল পলাশের বনে এসে এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ লাগলো তার মনে। অনেকটা যেনো তাকে শান্তিনিকেতনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। 

বারবার অতীতের ভুলের কথা ভুলতে চেষ্টা করছে, না না প্রবীরের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সে বেঁচে গেছে শুধু নয় নিজের অহংকার দম্ভ সব কোথায় মিলিয়ে গেছে। এটুকু শিক্ষা তার হয়েছে বাইরের কোনো চাকচিক্য নয় মানুষকে বিচার করতে হয় তার অন্তরের সত্তা দিয়ে। বউয়াদার বাবারও কিন্তু অনেক পয়সা, বিরাটকায় লাল বাড়িটার ছবি এখনও তার চোখে ভাসে। আসা যাওয়ার পথের ধারেই বাড়িটা পড়তো, ওই বাড়িরই একটা চারচৌকো গ্রীল দেওয়া বারান্দায়  সে দাঁড়িয়ে থাকতো কবে থেকে। যখন সে স্কুল থেকে ফিরতো তখন দেখতো ওই বারান্দায় তার আসার পথের দিকে চেয়ে বউয়া দা দাঁড়িয়ে আছে, আবার কলেজ থেকে ফেরার সময় ওই একই দৃশ্যপট। মাঝে মাঝে মনে হত পড়াশোনা করে কখন?  কিন্তু তার সব পড়াশোনা আর ভালোবাসা যে রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করেই ছিলো তা সেদিন সে বুঝতে পারেনি। 

একদিন রিহার্সালের সময় কথায় কথায় বলেছিলো, আমার বাড়ির লোক ভাবে আমি পাগল, কি করে এই গান আর বাংলা নিয়ে আমি এতো মাতামাতি করি, কিন্তু আমি কি করবো বল!  রবীন্দ্রনাথ যে আমার হৃদয়ের তন্ত্রে তন্ত্রে বয়ে চলেছে,তাঁর গানের অসাধারণ ফিলোসোফি আমাকে মুগ্ধ করে আর সেই টানেই মনে হয় চলে যাই কবির শিক্ষা নিকেতনে বিশ্বভারতীতে, 

অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা তুমি বাংলা এতো ভালো করে বুঝতে পারো কি করে?  

ম্লান হেসে সে উত্তর দিয়েছিল, আমার মায়ের কাছ থেকে, মা যে বিশ্বভারতীর ছাত্রী ছিলেন, 

তাইনাকি!  উনি কি বাঙালি? 

না, তবে কর্মসূত্রে আমার দাদুর পোস্টিং ছিলো বোলপুরে, পরবর্তী কালে দাদু বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটিতে ইকনমিক্স পড়াতেন, আর আসাতে আসতে রবীন্দ্রনাথ কে জানতে চেষ্টা করেন, বুঝতে চেষ্টা করেন, নিজের অজান্তেই দাদু কখন যনো প্রবল রবীন্দ্র অনুরাগী হয়ে পড়েন। 

তারপর? 

তারপর আর কি, কোন এক পৌষমেলায় এসে মায়ের সাথে বাবার পরিচয় হয়, মায়ের টানেই বাবা বারবার ছুটে যেতেন শান্তিনিকেতনে, একসময় ওদের বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু এতো ভালোবেসে বিয়ে করেও মাকে বাবা তাঁর যোগ্য মর্যাদা কখনও দিতে পারেননি। 

আমি হওয়ার পর শেষ কটা বছর মা দাদুর কাছেই থেকে গিয়েছিলেন, ওখানেই একটা ছোটো স্কুলে পড়াতেন আর মন ভরে গান গাইতেন, আমিও মায়ের সাথে থেকে থেকে ওই একই দিকে মন পড়ে থাকলো, আজও তার থেকে বার হতে পারলাম না। বাবা শুধু বলতেন যে আমি যা ভালোবাসি তাই যেনো করি, তখন হয়তো মায়ের কথা ভেবেই বলতেন, মা যে ওতো তাড়াতাড়ি চলে যাবেন তা বাবা বুঝতেই পারেন নি। মায়ের মৃত্যু বাবা মেনে নিতে পারেননি খুব ভেঙে পড়েছিলেন আর আমাকে আঁকড়ে থাকেন  এখন, আমার মধ্যে দিয়েই মাকে খোঁজেন হয়তো। 

মনকলিকে এ কথাগুলো খুব গভীর ভাবে স্পর্শ করলেও ভালোবাসা বা টান কোনদিন অনুভব করেনি। আজ কিন্তু বউয়াদার মতন মানুষকেই ফিরে পাওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে। 

কিন্তু কোথায় তাকে পাবে জানেনা। এখানে আসার আগে গিয়েছিল সে শান্তিনিকেতনে, বিশ্বভারতীতে খোঁজ করে জানতে পারে বউয়াদা পুরুলিয়ার কোনো কলেজের প্রফেসর হয়ে চলে এসেছে। সত্যি কথা বলতে সেও একই আশায় এখানে এসেছে যদি সে খুঁজে পায় তার পুরানো বউয়াদাকে, যে তাকে পাগলের মতন ভালোবাসতো, তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যান পেয়েই সে চলে এসেছিল, একরকম নিজেকে একলা করে শুধু নিজের কাজ করে গেছে শান্তিনিকেতনের নিরালা নিভৃত কোণে। ওখানে তার সাথে দেখা হয়েছিল তার পুরানো বন্ধু সুচরিতার সাথে, সুচরিতাও পড়ায় বিশ্বভারতীতে, সুচরিতার মুখেই শুনেছিল বউয়দা ফিলোসোফি তে ডক্টরেট করেছে, রবীন্দ্র দর্শনের ওপরই সে থিসিস লেখে যা বিপুল ভাবে সর্বত্র সমাদৃত হয়।  মাঝখানে দুবছর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল ইউরোপের ফিলোসফারদের ওপর কাজ করতে, তাদের দর্শন নিয়ে নানা তথ্য আলোচনা ও রিসার্চ করে,বিদেশের অনেক বড়ো বড়ো ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ানোর অফার পেয়েও নেয়নি, সুচরিতার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল আমার শিক্ষা আমি আমার দেশের ছেলেমেয়েদের দেবো, বিদেশের কোনো মোহ আমার নেই। 

সুচরিতার সাথে দুদিন ছিল তখন অনেক কথাই হয়েছিল। সুচরিতা বলেছিল আমি বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিলাম রে মানুষটাকে, 

কোনদিন বলিস নি? 

- হ্যাঁ রে বলেছিলাম, 

- কি বললো? 

- কবির কবিতায় উত্তর দিলো, " ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো এ তরী "। 

তোমাকে দেওয়ার মতন আমার কিছু আর নেই সুচরিতা, আমি নিশ্ব, সব কিছু একজনকে দিয়েই নিশ্ব হয়ে বসে আছি। শুধু শুধু তোমাকে ডেকে এনে অসম্মান করতে পারবোনা, আমাকে ক্ষমা করো। 

তারপরই পুরুলিয়ায় চলে যায়, যাবার আগে আমার সাথে দেখা করে বলে যায়, ভালো থেকো সুচরিতা, খুব ভালো থেকো, শুধু শুধু কষ্ট পেয়োনা, আমি জানি প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা বড়ো মর্মান্তিক, আমি চাইনা আমার জন্য কেউ এ কষ্ট পাক, মনে কোরো ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিলে, নতুন করে বাঁচতে হবে তোমাকে, তোমার জন্য অনেকে হাত বাড়িয়ে দেবে, আমার শুভকামনা তোমার সাথে সবসময় থাকবে, যেদিন জীবনের পরিপূর্ণতায় ভরপুর হয়ে যাবে সেদিন এই দাদাটার কাছে এসো কেমন!  আজ আমি যাই। 

তারপরও সুচরিতা বলে যেতে লাগলো অনেক জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন কলেজ, কি ঠিকানা?  ম্লান হেসে উত্তর দিলো, আমি যে নিজেই জানিনা কোথায় হবে আমার ঠিকানা!  ঠিকানাবিহীন পথে চলে চলেই তো আমি অভ্যস্ত, পেয়ে যাবো কোন একটা ঠিকানা, 

- তাহলে কি করে জানলি বউয়াদা পুরুলিয়ায় গেছে? 

- এক কলিগের মুখে শুনেছিলাম পুরুলিয়ার কোন একটা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছে। 

সেই কথা শোনার পরে সে এক অসীম আশায় ভর করে পুরুলিয়ায় এসেছে। 

ক্রমশ


Saturday, 14 January 2023

নতুন ভোরের আলো

 বিভাগ -- গদ্যে কবিতা

শিরোনাম - নতুন ভোরের আলো 

কলমে-- পারমিতা চ্যাটার্জী 


সূর্যের শেষ রেখাটা ডুবে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশে, 

দিনের আলোর রেখা নিভে গেলো আধারের অন্তরালে। 

রাত বড়ো প্রিয় আমার,

অন্ধকারের অন্তরালে আমার একলা আকাশকে আমি খুঁজে পাই। 

একটু পরেই তো ঝলমল করে উঠবে যত তারা, 

ওরা আমায় ডেকে বলবে-

" ও মেয়ে আধার ঘরে সাঁঝাবাতি জ্বালবিনা?

আমি বলব-- আমার সাঁঝবাতি যে তোমরা-

তোমরাই তো আমার নীরব মনের কোণে কোণে আলোর রেখা টেনে দিয়ে যাও, 

সেই আলোই তো আসতে আসতে মিশে যায় এসে প্রথম ভোরের আলোর অন্তমিলে"। 

সূর্য ওঠা ভোর নিয়ে আসে আর একটা নতুন দিন, 

আর আমি সেই নতুন দিনের  চৌকাঠ ধরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি। 

অপেক্ষায় থাকি আবার কখন আসবে রাতের অন্ধকার,

তারার ফাঁক দিয়ে ভেসে বেড়ানো মেঘের আঁচলে লিখে যাই জীবনের যত না বলা কথা -

যা কোনদিন কাউকে বলা হয়নি, 

বলার অপেক্ষায় কেটে গেছে 

জীবনের গোধূলি বেলা, কিন্তু হয়নি বলা,  বলতে এসে বারবার শুধু ফিরে গেছি,

প্রত্যাখ্যানের ব্যাথা বেদনার সব কথাই লেখা আছে অদৃশ্য মেঘের আঁচলে, 

না বলা কথাটা না বলাই থাক, 

সামনে দিয়ে নদীটা শুধু বয়ে যাক। 

" ও বৃষ্টি তুমি মেঘের আঁচল থেকে মুছে দিওনা আমার লেখা কথাগুলো। 

তোমার অঝোর ধারায় ভেজা মনের অনেক কথা লেখা আছে সেই আঁচলে, 

তুমি তাকে বাঁচিয়ে রেখো"। 

রাতের কোলে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখা কখন শেষ হয়ে যায়, 

আবার আসে নতুন ভোরের আলো আর আমি আবার আজকে দিনের দরজা ধরে থমকে দাঁড়িয়ে  যাই ।

স্মৃতিচারণ

 স্মৃতিচারণ 


জীবনটা আসা যাওয়ার পথ,  কেউ আসে কেউ  চলে যান অনন্তের পথে। 

যিনি চলে যান তিনি সত্যি কি চলে যান?  রবীন্দ্রনাথের কথায় " নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে "। 

হ্যাঁ তিনি রয়ে যান হৃদয়ের মাঝখানে - প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্ত তার উপস্থিতি বুঝিয়ে দেন, আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকবো  তোমাদেরই সাথে, শুধু একটু খুঁজে নিতে হবে। 

শোক একসময় প্রশমিত হয়,  কিন্তু মানুষের স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকে চিরকাল বুকের একান্ত নিভৃতে। 

যার যখন জীবনের খেলা শেষ হয়ে যায়, সে যাত্রা করে অনন্তের পথে, শান্তির পারাবারে। যার সঙ্গে জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কেটেছে খেলার ছলে, আনন্দের ছলে, স্নেহ অসীম মমতার গাঢ় বন্ধনে, হঠাৎ একদিন সকালে দেখা যায় সেই খেলা থেমে গেছে, তাই রবীন্দ্রনাথের গান আবারও মনে পড়ে, " হঠাৎ খেলা শেষে আজকে দেখি ছবি, স্তব্ধ আকাশ নীরব শশী রবি, তোমার চরণ পরে নয়ন করে নত,  ভুবন দাঁড়িয়ে আছে একান্ত " খেলা যখন ছিল তোমার সনে তখন কে তুমি তা কে জানতো "। 

যতক্ষণ জীবনের খেলা চলে ততক্ষণ জীবনের পরম প্রিয় মানুষটার অস্তিত্ব আমরা বুঝতে পারিনা, তাঁর উপস্থিতিটাই আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়, তার অনুপস্থিতি আমাদের কাছে এক বিরাট ফাঁক বেদনা বহুল বিচ্ছেদের জায়গা তৈরী করে, আবার জীবন চলতে চলতে সেই অনুপস্থিতি ও আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। কিন্তু সেই প্রিয় মানুষটির অমূল্য স্মৃতি থেকে যায় হৃদয়ের গোপন অন্দরে,  মাঝে মাঝে সেই অন্দর থেকে মুখ বার করে তিনি বলেন, " আমি আছি রে, আমি আছি " শুধু আমার পায়ের চিহ্নটা পড়ছেনা,তবুও আমি আছি।

Tuesday, 10 January 2023

Blog name -- পারমিতার নিবেদন


বিদায়

 বিভাগ কবিতা

শিরোনাম -বিদায়

পারমিতা চ্যাটার্জী


আমার মন কেমনের সকালবেলায় সে এসে দাঁড়িয়েছিল।

শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরা সন্ধ্যাবেলায় বলেছিল

ভালোবাসি।

শরতের ভোরের ছোঁয়ায় দু মুঠো শিউলি তুলে দিয়েছিল হাতে।

ফাগুনের সমীরণে গান শুনিয়েছিল রাতে।

হেমন্তের কুয়াশা ঢাকা আলো না ফোটা ভরে

ভেজা শিশিরে পা ডুবিয়ে হেঁটেছিল হাত ধরে।

শীতের নরম রোদে শুকনো মুখে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল মুখে ছিল একটুকরো হাসি।

গোপন ব্যাথা আড়াল করে বলেছিল

এবার তবে আসি।

Monday, 9 January 2023

বিয়ের তারিখ

 বিয়ের তারিখ

পারমিতা চ্যাটার্জী


গান শিখতে গিয়ে জয়তী ভালোবেসেছিল সুজিতকে।

ভালোবেসে আবদ্ধ হয়েছিল বিবাহ বন্ধনে কোন এক শুভ লগ্নে। ভালোবেসে ছিল সাধারণ সুজিতকে। অর্থের দৈনতা কেড়ে নিতে পারেনি তাদের নিঃস্বার্থ প্রেমকে। প্রতি বিয়ের তারিখে তারা দুজনে হারিয়ে যেত এখানে সেখানে। বলেছিল সুজিত এ দিনটা শুধু তোমার আমার আর কেউ থাকবেনা আমাদের মাঝে। দুজনের ভালোবাসায় জয়তীর কোল আলো করে জন্ম নিয়েছিল তাদের কন্যা দিশা। দিশাকে ভালো রাখবে বলে সুজিতকে পেয়ে বসে উচ্চাশার নেশায়। সে ছুটেছিল অর্থের পেছনে। ছুটতে ছুটতে সে ভুলে গেল সেদিনের অঙ্গীকার ভালোবাসার নেশা। এই বৈভব ভালো লাগতনা জয়তীর। সে বলল, কি হবে এমন পয়সায় যেখানে সংসার হয়ে যাচ্ছে এক প্রাণহীন যন্ত্র?  উত্তরে সুজিত তাকে বলেছিল সময়ের সাথে নিজেকে বদলে ফেল না হলে কষ্ট পাবে--

- কষ্ট তো পাচ্ছি মনে হচ্ছে যে মানুষটাকে ভালোবেসে সব ছাড়লাম সে মানুষটাকেই তো হারিয়ে ফেলেছি--

-মানুষটা একই আছে এখনো আমরা বিয়ের তারিখ একলা কাটাই-

- হ্যাঁ কাটাই কিন্তু নিয়মের বেড়াজালে ---

-- মানে কি চাও তুমি? দামী অর্কিড নিয়ে আসি, নিয়ে আসি দামী উপহার, বড় হোটেলে খেতে নিয়ে যাই সবই তো করি তোমার ভালো লাগবে বলে--

-- আসলে কি বল তো সুজিত তুমি মানুষটাই বদলে গেছ তাই আমার ভালোলাগাটাও ভুলে গেছ--

-- আমার সেই প্রথম ভালোবাসার ঘরে তোমায় আমি অনেক কাছে পেতাম, আমার সেই সুজিত আমার জন্য সাদা টাটকা রজনীগন্ধার স্তবক আনত আমি তাকে সাজিয়ে রাখতাম কাঁচের গ্লাসে,  আমরা ঘুরে বেড়াতাম এলোমেলো এখানে সেখানে, খেতাম অনাদি কেবিনের মোগলাই পরোটা--

-- অবস্থার পরিবর্তন তো হয়ই সেই পরিবর্তনটাকে মানিয়ে নিতে হয় এটাই নিয়ম, যাক অনেক রাত হয়েছে কাল আমায় টুরে যেতে হবে এবারের টুর একমাসের --

-- একমাসের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছ আর আমায় আগের দিন জানাচ্ছ?

- আরে আমি নিজেই তো সবে জানলাম টাকাপয়সা সব রেখে যাচ্ছি তোমাদের কোন অসুবিধা হবেনা, তাছাড়া তোমার তো গান শেখানো আছেই যেন টিউশনের টাকাটা না পেলে খেতে পাবেনা। জয়তী স্তব্ধ হয়ে গেল কান্নায় তার গলা বুজে এলো তবু কান্নাধরা গলায় বলল আজকাল তো বেশীরভাগ সময় বাইরেই কাটাও তোমার সেক্রেটারি নীপার সাথে-

-- জয়তী বোকার মতন কথা বোলনা নীপার সাথে আমার কাজের সম্পর্ক যাক রাত হয়েছে অনেক নিজেও ঘুমোও আমাকেও ঘুমোতে দাও ভোরের ফ্লাইট ধরতে হবে বলে সুজিত পাসফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পরে। জয়তীর চোখে তখন ধারা শ্রাবণ তারমানে একমাসের আগে ফিরবেনা আর কুড়িদিন পর তাদের বিয়ের তারিখ সেটাও তাহলে সুজিত এবার ভুলে গেল।

সুজিত চলে যাবার পর জয়তী ঠিক করল ওই তারিখে ও যদি সত্যি নাআসে তবে জয়তী মেয়ে নিয়ে বাপেরবাড়ী চলে যাবে।সুজিতের হয়ত তাতেও কিছু যায় আসবেনা বলবে তোমাদের খাওয়া পড়ার খরচ দিয়ে দেব, নিজে এখন উগ্র আধুনিক নীপাকে নিয়ে খুব ভালো থাকবে যতই হোক জয়তীতো এখন পুরানো হয়ে গেছে না?

কুড়ি দিন পর তাদের বিয়ের তারিখ দেখতে দেখতে  এসে গেল। শেষ মুহূর্ত অবধি অপেক্ষা করে যখন সুজিত এলোনা জয়তী তখন ঠিক করল সকালে উঠেই চলে যাবে সুটকেস গুছিয়ে নিল। ভোরবেলা উঠে এক কাপ চাখেয়ে বাথরুমে গেল। বাথরুম থেকেই শুনতে পেল তার ফোন বাজছে। তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে এসে ফোনটা ধরতেই দেখল ওটা সুজিতের ফোন কোনরকমে বলল, হ্যালো----

হ্যালো হ্যাপি এ্যানিভারসারি--

-- ও ফোনেই সেরে দিচ্ছ---

-- কি করব বল যা কাজের চাপ--

-- তুমি থাকো তোমার কাজ নিয়ে আমি চললাম আমার বাপেরবাড়ী--

-- ও তাই যাও এখানে তোমার খুব একা লাগে আমি বুঝতে পারি--

জয়তীর রাগে আর মুখ দিয়ে কোন কথা বার হলনা ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানায় ছুটে গিয়ে কান্নায় লুটিয়ে পড়ল। তিনমিনিটের মধ্যে দরজায় বেল। 

-উফ্ কে আবার এলো এখন নিশ্চই দুধওয়ালা একটু ভালো করে কাঁদতেও দেবেনা।

দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল এ গোছা সাদা টাটকা রজনীগন্ধা নিয়ে সুজিত দাঁড়িয়ে হাসছে। জয়তী অনেকদিন পরে ঝাঁপিয়ে পরল সুজিতের বুকের ওপর, ' তুমি খুব বাজে',  সুজিতও ওকে সবলে নিজের বুকে চেপে ধরে বলল আর তুমি খুব বোকা একদম বোকা মেয়ে একটা।

Sunday, 8 January 2023

পারমিতার নিবেদন

 একলার পথ
পারমিতা চ্যাটার্জী 

আমি তো শুধু তোমায় ভালোবেসেই হেঁটে চলছিলাম
একটার পর একটার পথ,
শুধু বুঝিনি  শেষ হল কখন ভালোবাসার পথ,
কখন ডাল ছিঁড়ে পড়ে গেছে প্রথম ভালোবাসার
প্রথম  কুড়িখানি।
তবু তুমি আছ  আসা  যাওয়ার মাঝঘানে,
শূণ্য মনের গওহ্বর  জুড়ে,
বৃষ্টি রাতের ভিজে  যাওয়া  স্মৃৃতির হাত ধরে,
খোয়াইয়ের  চড়াই  উতরাইয়ের  রাস্তার ঢালে
আমার  সমস্ত  অন্তর  জুড়ে।
ছিড়ে পড়ে যাওয়া  কুড়িখানা রাখা আছে
হৃদয়ের গোপন ভাণ্ডারে।
রাতের নীরবতায় যখন তারাগুলো লুটোপুটি খায়
নিঃসঙ্গ শয্যায়,
তখন শুকনো কুড়িটাকে বার করে হেঁটে যাই
অতীতের হাত ধরে।
হয়তো এভাবেই  হেঁটে যাব দূরে অন্যকোনখানে,
ভয় নেই গো তোমায় আর ডাকবনা,
আমার নীরবতার কোণটি আধার ঘরে
আপনি দুলে যাবে,
সাথী হীন নিস্তব্ধ  রাতের  মতন।