Tuesday, 14 February 2023

মধুর মিলন

মধুর মিলন 
পারমিতা চ্যাটার্জি 

আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে।  নবমিতা আপনমনে  হাসে। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসের ফাঁকে বন্ধু দের  গল্প শোনে কার স্বামী  বা প্রেমিক কাকে কি দিয়েছে। নবমিতা প্রার্থনা করে  ওদের  এই হাসিখুশি মুখটা যেনো  চিরকাল  থাকে। ওর মতন যেনো হাসির আড়ালে বেদনাকে লুকিয়ে রাখতে না হয়। 
তার বিয়ে হয়ে গেছে। নামেই বিয়ে হয়েছে। ফুলশয্যার দিন তার স্বামী তাকে জানিয়ে দেয় যে এ বিয়েটা সে বাবা মায়ের ইচ্ছেতে করেছে, তাছাড়া আরও বলে সে তো অনেক ছোটো এতো ছোটো বয়েসে পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট থাকা সত্বেও সে কেনো বিয়ে করে নিলো, কেনো আরও পড়াশোনা করলোনা?  তার স্বামী তার থেকে আট বছরের বড়ো। ডক্টোরেট করে ইউনিভার্সিটির লেকচারার তাছাড়াও পোস্ট ডক্টরেট করছে। তার আন্ডারে  বেশ কিছু স্টুডেন্ট থিসিস করছে। হয়তো তার মনের মতন নিজের পছন্দের কেউ আছে। ফুলশয্যার রাতে ফুল দিয়ে সাজানো খাটে তার চোখ ভর্তি অশ্রু এসে যায় কোনো রকমে বলে আমাকে ছমাস সময় দিন  আমার এম এ পরীক্ষা টা হয়ে যাক তারমধ্যে আমি যেকোনো একটা চাকরি জোগাড় করে চলে যাবো। 
স্বামী অনিমেষ মানুষটা খুব ভদ্র এবং অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ সে তাড়াতাড়ি বলে তোমার সব দায়িত্ব আমার, তোমার কোনো অসুবিধা হবেনা,  শুধু স্বামী- স্ত্রী সম্পর্ক টা থেকে দূরে থাকবে সেদিন সে বলে আসলে আমি আর একজনের কাছে দায়বদ্ধ। 
নবমিতা অত্যন্ত অপমানিত হয়ে বললো এতো শিক্ষিত হয়ে আপনি শুধু বাবামায়ের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট করলেন? 
অনিমেষ তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরতে চাইলে সে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলেছিল দয়া করে আর অপমান করবেন না এমনিতেই আমি যথেষ্ট অপমানিত বোধ করছি। অনিমেষ বলেছিল সত্যি আমি খুবই দুঃখিত হয়তো একসাথে থাকতে থাকতে সময় সবকিছু ঠিক করে দেবে - 
কি ঠিক করবে সময়?  আজকের রাতটা একটা মেয়ের জীবনে কতোটা মূল্যবান আপনি জানেন না?  এই রাতটা কি আর ফিরে  আসবে?  তাছাড়া আমি একটু দূরে চাকরি নেবার চেষ্টা করবো যাতে সবার থেকে সরে গিয়ে একা নিজের মতন করে থাকতে পারি। 
নবমিতা দেখলো অনিমেষের দুচোখে একটা দুঃখ ভরা মমতা। নবমিতা একটা বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। কান্নার দমকে তার শরীরটা ফুলে ফুলে  উঠছিলো। সে অনিমেষ কে একথাও জানিয়ে দিয়েছে  যে অনিমেষের কোনো দয়ার দান চায়না নিজের খরচ সে নিজেই চালিয়ে নিতে পারবে। 
বিয়ের পরেরদিন একটা সাধারণ গোলাপি তাঁতের শাড়ি পড়ে তার মায়ের দেওয়া অল্প কিছু গহনা পরে ঘরের বাইরে এলো। বাইরে এসে দেখলো তার স্বামী অনিমেষ ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে নবমিতা একটু অস্বস্তিতে পরে সেও জিজ্ঞাসু মুখে স্বামীর দিকে তাকালো নবমিতাকে বললো, এক মিনিট একটু দাঁড়াও আমি এখুনি আসছি। নবমিতা অবাক হয়ে ভাবলো আবার কি তাকে অপমানিত হতে হবে না কি!  কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখলো তার স্বামী একটা ক্যামেরা নিয়ে এসে বললো, তুমি খুব সুন্দর দেখতে কাল রাতে এতোটা বুঝতে পারিনি সাধারণ সাজ পোশাকে তোমাকে খুব মিষ্টি লাগছে। আমি ছবি তুলতে খুব ভালোবাসি তোমার একটা ছবি নেবো। বিস্মিত নবমিতা আরও অবাক হয়ে গেলো তার মনে পড়লো সত্যি কাল রাতে অনিমেষ তার মুখের দিকে ভালো করে তাকায়নি তাই সে হাত দিয়ে স্বামী কে থামিয়ে দিয়ে বললো একটা সম্পর্কহীন মানুষের ছবি তুলে তাকে আর অসম্মানিত করবেন না প্লিজ। 
অনিমেষ বুঝতে পারলো নবমিতার প্রচণ্ড আত্মসম্মান বোধ। নিজের কাছে নিজেই ছোটো হয়ে গেলো। 
নবমিতা একটা বাক্স নিয়ে শাশুড়ি মায়ের ঘরে দাঁড়িয়ে বললো, মা আসবো?  হ্যাঁ  হ্যাঁ নিশ্চয়ই এসো। শাশুড়ি বিভা দেবী  লক্ষ্য করলেন তার চোখ মুখ অত্যন্ত ফোলা আর খুব শুকনো তবুও তার রূপের মাধুর্যে তিনিও বলে ওঠলেন বাহ্ সকালে এই সাধারণ সাজে তোকে কি সুন্দর লাগছে রে!  কিন্তু চোখ মুখ এতো শুকনো কেনো?  নবমিতার চোখ দুটো জলে ভর্তি হয়ে উঠেছিল সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, মা এই গয়নাগুলো তোমার কাছেই রেখে দাও, এতো জিনিস আমি কোথায় হারিয়ে ফেলবো। বিভাদেবী যেনো কিছু বুঝতে পারলেন ওর থুতনি ধরে আদর করে বললেন এসব আমি তোকেই দিয়েছি রে মা আর  তোর ননদরা এবাড়ির আত্মীয় স্বজনরা সব তোকে ভালোবেসেই দিয়েছে তুই আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছিস?  না মা ফিরিয়ে দিইনি আমি খুব অগোছালো তাই যদি হারিয়ে ফেলি তাই তোমার কাছে দিলাম আর তাছাড়া ---
তাছাড়া?  
এসবের যোগ্যতাও হয়তো আমার নেই। এই বলে সে ঘরের বাইরে যেতে গিয়ে দেখলো অনিমেষ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেলে অনিমেষ তাকে বললো, একটা কথা বলবো শুনবে? 
নবমিতা বললো, যা বলার বলে দিয়েছেন তো আর তো কিছু বলার নেই । অনিমেষ বললো আছে, অনেক কিছু বলার আছে সব একরাতের মধ্যে বলা সম্ভব হয় না। 
নবমিতা ওখান থেকে সরে এলো কারণ তার তখন কান্নায় গলা বুজে এসেছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে শাশুড়ির কাছে গিয়ে বললো, আমি কি চা করবো?  বিভাদেবী তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন আরে অষ্টমঙ্গলা টা যাক তারপর রান্নাঘরে ঢুকিস। কাল থেকে তো ভালো করে খাস নি, বল কি জলখাবার খাবি?  তাঁর শ্বশুর মশাই  অলকেশ বাবু বললেন আজ থেকে আমাদের মা এসে গেছে, মা যা মেনু ঠিক করবে তাই হবে। 
নবমিতা মুখ নামিয়ে নিয়ে বললো,  না না আমি কেনো? যা হবে তাই খাবো। একটু পরে কাজের মাসি আরতিদি ট্রে তে করে সবার জন্য চা বিস্কুট সাজিয়ে নিয়ে এলো। তার ননদরা আজ অবধি আছে সন্ধ্যা বেলায় সবাই চলে যাবে। প্রথমদিন মনে আছে ঢালাও লুচি তরকারি হলো আর ননদদের আবদারে অনিমেষ গরম বোঁদে নিয়ে এলো। 
এইভাবেই জীবন আরম্ভ হলো। তার কলেজ যাওয়ার সময় অনিমেষ তাকে গাড়ি করে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিল সে ভিষণ ভাবে আপত্তি জানিয়ে বলেছিল আমি নিজেই যেতে পারবো। এখন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে প্রিয় বন্ধু নিবেদিতা তাকে দুটো টিউশন জোগাড় করে দিয়েছিল, সে টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফেরে। তাছাড়া গান তার প্রাণের জিনিস গানেও সে ডিপ্লোমা প্রাপ্ত তাছাড়া বহু নামকরা শিল্পীদের কাছে গান শিখতো, তাই দুটো গানের স্কুলেও চাকরি নিয়েছিল। শ্বশুর বাড়িতেও সকালে উঠে সকালের চা সবার জন্য জলখাবার বানিয়ে তারপর ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি হত। রাত জেগে পড়াশোনা করতো। এরমধ্যে লক্ষ্য করেছে তার স্বামীর অনেক পরিবর্তন। ক্রমশ যেনো তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। 
একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে আর নবমিতার টিউশন পড়িয়ে  আসতে বেশ দেরি। বাসে খুব ভীড় তাই দু চারটে বাস ছেড়ে দিয়ে তবে অনেকক্ষণ পরে একটা বাস পায়। সত্যি কথা নবমিতার বাবার গাড়ি ছিল তার বাসে চড়ার অভ্যাস খুব একটা নেই তবু পরিস্থিতি মানুষকে সব অভ্যেসেই অভ্যস্ত করে তোলে। সেদিন তার বাস থেকে নেমে দেখে অনিমেষ অত্যন্ত উত্কণ্ঠা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে নামতে দেখেই তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে ছাতার তলায় নিয়ে এসে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে গাড়িতে ওঠায়। বাসস্ট্যান্ড থেকেও তার শ্বশুর বাড়িটা আরও কিছুটা দূরে। নবমিতা গাড়িতে বসে বললো আমার জন্য এতো কষ্ট করার দরকার ছিলোনা। অনিমেষ ওর দিকে একটা তোয়ালে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, বেশি কথা না বলে মাথাটা ভালো করে মুছে নাও একদম ভিজে গেছো তো কাল আবার জ্বর না এসে যায় । 
অনিমেষের এই চিন্তা বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে নবমিতা।  তাদের ঘরের লাগোয়া একটা ছোটো ঘর আছে, নবমিতা সেখানেই তার নিজের থাকার জায়গা করে নিয়েছে। রাত জেগে সে পড়ে বলে অনিমেষ প্রায় রোজই তাকে গরম কফি করে এনে দেয় আর নিজেও এককাপ খায় কারণ সেও রাত জেগে তার রিসার্চের কাজ করে। একএকদিন নবমিতাও দুজনের জন্য কফি করে নিয়ে আসে। গত দুদিন ধরে দেখছে তাকে জোর করে তার পড়ার টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে বসে কফি খেতে অনুরোধ করছে। সে বাপেরবড়ি গিয়ে দুদিন থাকতে না থাকতেই অনিমেষ গিয়ে উপস্থিত হয় আর তাকে নিয়ে আসে। নবমিতার মা মনে মনে হাসে আর বলে খুব বর সোহাগি দেখছি, মোটে ছেড়ে থাকতে পারেনা। নবমিতাও তার বাপেরবড়িতে তার জীবনের কথা গোপন রেখেছে। 
আজ সকালে সে চান করে এসে দেখে তার ছোটো ঘরের টেবিল আর ড্রেসিং টেবিলের ওপর অনিমেষ খুব সুন্দর ফুলদানিতে ফুল সাজিয়ে দিয়ে বলেছিল, ' হ্যাপি ভেলেনটাইনস ডে। 
আজ কলেজ থেকে বেরিয়ে দেখে অনিমেষ গাড়ি নিয়ে তার ইউনিভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, সে তো অবাক!  বন্ধু রা সব হেসে বলছে দেখ আজকের দিনে তোরা বর সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছে। নবমিতার লজ্জাও করলো আবার রাগও হলো কি দরকার এসব আদিখ্যেতার সত্যি টা তো আর এতে বদলে যাবেনা। সে গাড়ির কাছে এসে বললো, ' এ কি আপনি '!
হ্যাঁ আমি আজকের দিনে চলে এলাম আমার জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট মানুষটাকে কিছু বলার জন্য। 
অনিমেষ গাড়ি চালিয়ে দিলো সোজা চলে গেলো বাসন্তি হাইওয়ে ধরে। নবমিতা আশ্চর্য হয়ে বললো আমরা কোথায় যাচ্ছি? 
অনিমেষ মুচকি হেসে উত্তর দিলো চলোই না ঠিক দেখতে পাবে। একটা সুন্দর রিসোর্টের কাছে এসে তাদের গাড়ি থামলো। অনিমেষ তার হাত ধরে নামিয়ে বললো, এসো - 
নবমিতা আরও অবাক হয়ে বললো, এখানে?  
আরে এসোই না --। 
নবমিতা পায়ে পায়ে স্বামীর পেছন পেছন গেলো অনিমেষ রিসেপশনের কাছে গিয়ে বলতেই, রিসেপশনিস্ট বললো, হ্যাঁ স্যার  আপনাদের ঘর রেডি আছে। 
ঘরে ঢুকে  অনেমেষ দুকাপ কফি আর কিছু স্ন্যাকসের অর্ডার করলো। তারপর নবমিতার হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট দিয়ে বললো, এটা তোমার জন্য -- 
আমার জন্য ?  কেনো?  
খুলেই দেখোনা পছন্দ কি না? 
নবমিতা দেখলো একটা হালকা গোলাপি রঙের আগাগোড়া চিকনের কাজ করা খুব সুন্দর একটা শাড়ি । 
অনিমেষ ওর কাছে বসে ওর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো, পছন্দ? 
হ্যাঁ পছন্দ তো বটেই কিন্তু হঠাৎ আমার জন্য কেনো সেটাই বুঝতে পারছিনা? 
বুঝবে আসলে তুমি সব কিছুই একটু দেরিতে বোঝ বা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাওনা, 
মানে? 
মানে এইযে প্রথম রাতের কথাটাই ধরে রেখে দিয়েছো আর আমি যে তোমাকে এতোটা ভালোবেসে ফেলেছি সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইছোনা। 
নবমিতা সত্যি হাঁ করে বসে থাকলো, তার বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখদুটো জলে প্রায় ভরে এসেছে, অনিমেষ কাছে এসে দু'হাতের তালুতে তার মুখটা তুলে ধরে বললো, তোমার মতন এতো সুন্দর শান্ত স্নিগ্ধ একটা মেয়েকে ভালো না বেসে থাকা যায়?  তার কপালে এই প্রথম একটা ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিলো। নবমিতা দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো আর অনিমেষ তাকে দুই বাহু দিয়ে বুকের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো, কাঁদেনা, অনেক কেঁদেছো এবার থেকে আমরা শুধুই হাসবো কেমন?  আর তোমাকে কাঁদবার কোনো সুযোগ দেবোনা। এরপর দুজনে নিভৃতে এক অপরূপ ভালোবাসার মিলনে হারিয়ে গেলো। 
নবমিতা মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে বললো, তুমি খুব খুব বাজে,
অনিমেষ ওকে আরও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে বললো,  হ্যাঁ আমি সত্যি খুব বাজে কিন্তু আমি তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি।

No comments: