Thursday, 23 February 2023

মনকলি - পর্ব ৫

মনকলি --৫
ক্রমশ রাহুলের গাড়ি ছুটে চলেছে শান্তিনিকেতনের দিকে। গুসকরা পার হয়ে গেলো আর কিছুটা এগোলেই বোলপুর। কোপাই নদীর কাছে এসে গাড়ি একটু থামালো। আকাশে আজ পূর্ণ চাঁদ  রাহুুল নামলো কোপাইয়ের ধারে। নেমে গেলো তরতর করে নদীর একদম কাছে। পাথর কেটে কেটে তিরতির করে এগিয়ে যাচ্ছে নদীটা রাহুল দেখলো চাঁদের ছায়াটা স্থির হয়ে আছে , বড়ো শান্ত রূপ তার। মনে হলো কোথায় যেনো চাঁদের  এই ছায়ার সাথে  মিল আছে সুচরিতার। একান্ত নীরব নীরবতার মধ্যে দিয়ে পরিপূর্ণ তার হৃদয়ের ভালোবাসা। 
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো,রাহুল দেখলো সুচরিতার ফোন। ছেলেমানুষের মতন উচ্ছ্বসিত হয়ে রাহুল, আমি আসছি সুচি আমি এখনই আসছি। আমাকে যে আসতেই হবে তোমার কাছে। 
সুচরিতা কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে গেলো তার বউয়াদার উচ্ছ্বসিত গলা শুনে ভাবলো, এতোদিনে কি তার অপেক্ষার দরজায়
 সত্যি বসন্তের বাতাস লাগলো? কিন্তু মনকলি ও য অনেক আশা নিয়ে পুরুলিয়ায় গেলো চাকরি নিয়ে, ওকে যে তো সুচরিতাই বলেছিল যে তোর ভালোবাসা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে,
 তোকে শুধু খুঁজে নিতে হবে। 
কিন্তু সে কি করবে!  তার তো কিছুর করার নেই  তখনও পর্যন্ত তো সে জানতো বউদার মন জুড়ে
শুধু মনকলি আছে। তাই সেদিন তার প্রেম মর্যাদা  পায়নি  বউদার কাছে, আজ সে কি করবে! কিছু  তো করার নেই  কিছুটা  অপমানের সাথে হলেও বউয়াদা সত্যি তাকে ভালোবাসা অর্পণ করে তবে তা ফিরিয়ে দেওশার ক্ষমতা তার নেই। 
একটু পরেই বেল বাজলো  তারমানে বউদা এসে গেছে। শান্ত  ধীর পায়ে গিয়ে সে দরজা খুলে  দিলো, রাহুল প্রথমে একটু দাঁড়ালো তারপর এগিয়ে এসে দু'হাতে সুচরিতা কে বুকের কাছে টেনে আনলো তারপর তার মুখটা দু,হাতের তালুতে ধরে বললো, আমাকে গ্রহণ করবে তো?  
আমি তোমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে বুঝতে পারলাম মনটা আমার পুরোপুরি  বদলে গেছে। 
উচ্ছল দাম্ভিক কোনো মুখের আড়াল থেকে একটা শান্ত স্নিগ্ধ সুন্দর দুটো কালো চোখের মায়াভরা দৃষ্টি ভেসে উঠছে। মনে হলো তখন, উচ্ছল ঝর্ণা পাহাড়ের অনেক বাঁকের ফাঁকে হারিয়ে যায় কি শন্ত নদীটা তিরতির শব্দে বয়ে চলে। 
সে সুচরিতা কে দু'হাতের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বললো, নেবে তো আময়? 
সুচরিতার এতোদিনে বাঁধ ভেঙে গেলো, সে বউয়ার বুকে মাথা রেখে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লো। 
বউদা তার মাথায় হাত রেখে বললো, আমার এ ভালোবাসা অন্তর থেকে উঠে আসা পবিত্র ভালোবাসা।
কিন্তু মনকলি কে কি বলবে বউদা?  
আমার তো কিছু জবাব দেওয়ার নেই সুচরিতা, 
আর কেনোই বা জবাব দেবো বলো তো? 
হয়তো তুমি বলবে আমিই বা কেনো আসবো তোমার কাছে? জবাবে আমি বলবো আমি তোমাকে কোনো অসম্মান করিনি বা বলিনি যে তুমি আমার যোগ্য নও খুব শান্ত ভাবে নিজের কথা জানিয়েছিলাম। আসলে রোজ তোমাকে দেখতাম বলে বা তোমার হাতের প্রচুর যত্ন পেতাম বলে হয়তো নিজের মনকে বুঝতে পারিনি, ধরে নিয়েছিলাম এ যত্ন গভীর বন্ধুত্বের অঙ্গীকার। কিন্তু যে মুহূর্তে তোমাকে ছেড়ে চলে এলাম তখন শুধু তুমি আমার মনে জুড়ে বসলে, মনকলি কোথায় হারিয়ে গেলো। 
নিজেকে নিজে বলছিলাম, ' এ আমি কি করলাম!  নিজেকে নিজে বুঝতে পারিনি আর পারলামনা আর একজনের গভীর ভালোবাসার মর্যাদা দিতে। তখুনি তেমার কাছে আসতে পারছিলাম না কারণ লজ্জা আর অনুতাপে দগ্ধ হচ্ছিলাম। যে নিজে এসে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিল তাকে কেনো ফিরিয়ে দিলাম!  বড়ো বোকা আমি নিজেই বুঝিনি নিজেকে আর একজনের ভালোবাসায় মূল্য দিতে পারলামনা। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবেনা তো! 
কি করে ফিরিয়ে দে বলো তো!  সেই কোন ছোটবেলা থেকে ভালোবেসে আসছে, আজ যখন সে নিজে এসে কাছে দাঁড়িয়ে আছে তাকে ফিরিয়ে দেবার মতন ক্ষমতা আমার নেই। শুধু মনকলির সাথে বন্ধত্বটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। 
কেনো?  আমার জন্যে?  আমার মনের ঘরটা যে ছোটো সে ঘর থেকে একবার কেউ বেরিয়ে গেলে আর দ্বিতীয় বার ঢোকার জায়গা থাকেনা। 
কিন্তু আমি যে ওকে বলেছিলাম, বউয়াদা এখনও তোর অপেক্ষায় আছে, তুই পুরুলিয়ায় যা খুব সম্ভব বউয়াদা পুরুলিয়া গেছেন। 
আচ্ছা সুচরিতা এ উত্তরের ভারটা তুমি আমার ওপর দাও, যা সত্যি আমি তাই বলবো  আর তুমি যে নির্দোষ তাও বলবো যদিও এতো  কিছু  বিশ্লেষণ করে বলার জন্য আমরা বাধ্য নই ওর কাছে। বওয়া  সুচরিতাকে আরও কাছে টেনে ওরা কপালে পরে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বললো, কি মেয়েরে বাবা!  কখন এসেছি এতোটা পথ ধরে,এক কাপ চাও দিলো না।আবেশে সুচরিতার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল, বউয়াদার কথা শুনে   নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য ছটপট করে উঠে বললো, আরে এরকম করে ধরে রাখলে চা করবো  কি করে?  
তা আমি জানিনা। তারপরই হঠাৎ  ওকে গভীর আবেগে কাছে টেনে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে চোখ, ঠোঁট, গলা আকুল চুম্বনে ভরিয়ে দিতে লাগলো, এই আমার ভালোবাসা, এই আমার সব, তোর জন্যই আমার অপেক্ষা ছিলো রে শুধু বুঝতে দেরি হয়ে গেলো। 
ভালোলাগায় সুচরিতার মুখ ঢলে পরেছিল বউয়াদার বুকের ওপর, মনে হচ্ছিল তার কোনো জ্ঞান নেই। জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো শুধু আদরে পেট ভরবেনা, চা টা করে আনি আগে। 
ক্রমশ 

Tuesday, 21 February 2023

অমর ২১

অমর ২১
পারমিতা চ্যাটার্জি 




২১ শে ফেব্রুয়ারী আমাদের বাঙালিদের কাছে এক অন্যতম গৌরবান্বিত দিন। বংলা ভাষাকে বাঁচাবার জন্য জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সেদিন লড়াই করেছিল বাংলার দামাল ছাত্র সংগঠন। 
লক্ষ্য ছিল একটাই মাতৃভাষা কে বাঁচিয়ে রাখার এক অদম্য প্রয়াস। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতন। এই ভাষায় আমরা প্রথম মা কে মা বলে ডাকি। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষা যখন বলপূর্বক পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয় তখনই শুরু হয় বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। যা ভাষা আন্দোলন বলে পরিচিতি লাভ করে। 
এই লড়াই চালিয়ে যেতে বহু রক্তক্ষরণ হয়, খালি হয় বহু মায়ের কোল,  কিন্তু দামাল ছেলেরা লড়াই থামায় নি। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তারা জয় ছিনিয়ে এনেছিল সে জয়ের নাম অমর -২১। 
সে সময় একটা বাক্য বহুল প্রচার হয়েছিল " আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারী।এই দেশের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের পাশের দেশ বাংলা দেশের স্বপ্ন ও ঐতিহ্য। সেদিনের ইতিহাসের পাতায়  ছিলো নিরলস সংগ্রাম,  আত্মত্যাগ, ও হার না মানার এক প্রবল মনোবল। যে সব যোদ্ধাদের নাম আজও লেখা আছে বঙ্গমাতার ভাষাকে মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার তাদের নাম হলো, রাফিক,সালাম বরকত ও আবদুল জাব্বরেরা। 
উর্দু ভাষাভাষী পশ্চিম পাকিস্তান বাংলা ভাষায় অধিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ছিলো রুষ্ট। বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে তাই নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। আন্দোলনরত ছাত্র ও সমাজকর্মীদের ওপর বর্বর পুলিশের লাঠি ও নির্মম গুলিবর্ষণ শুরু হয়। পুলিশের এই নির্মম গুলিবর্ষণে রফিক, সালাম, আবদুল জব্বার, বরকত ও শফিয়ুল সহ অনেক তরুণ শহিদ হন। তাই এই দিনটিকে শহিদ দিবসও বলা হয়। 
এরপর অনেক জল বয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অক্লান্ত লড়াই ও আত্মত্যাগের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, যে দেশের মূল ভিত্তি ছিলো বাংলা ভাষা। শুধু মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাষা আন্দোলন কে কেন্দ্র করে এক নতুন দেশের জন্ম বোধহয় ইতিহাসের পাতায় এক বিরল দৃষ্টান্ত। 
আজ ঐতিহাসিক  ২১ শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রূপে সমগ্র বিশ্বে পালিত হয় এও এক বিরাট গৌরবান্বিত জয়। ভাষার জন্য এমন লড়াইকে বিশ্ব জানায় কুর্নিশ প্রতি মুহূর্তে। এই দিন শুধু লড়াই নয় ভাষাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আত্মত্যাগ, নিরলস সংগ্রাম এই মহান ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। 
কুর্নিশ জানাই রফিক, সফিউল, বরকত ও আবদুল জব্বাররের মতন অজস্র তরুণ ছাত্র ও সমাজকর্মীদের যাদের রক্তে রাঙা হয় আজও ২১ শে ফেব্রুয়ারী অমর ২১ নামে এক মহান আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সমগ্র বিশ্বের দরবারে। 
জানাই সেলাম অমর ২১। 
জানাই সেলাম সেই সব অমর ভাইদের যারা মাতৃভাষাকে সম্মান দিয়ে, মর্যাদা দিয়ে এই নিরলস সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে সফল করেছিলেন ভাষা আন্দোলন। 

Thursday, 16 February 2023

আমি আছি

কবিতা
আমি আছি
পারমিতা চ্যাটার্জী।

ভালোবাসার আকাশটা আজ বর্ণময়,
বসন্তের  প্রাঞ্জল  অনুভূতিতে
সজ্জিত রক্তরাগী মনটা
আজ নিভৃতের রেখা পেড়িয়ে 
বাইরে  এসে দাঁড়িয়েছে।
কোকিলের কুহুতানে গলা মিলিয়ে
নিভে যাওয়া কণ্ঠ কখনও সন্ধ্যারাগে
কখনও ভোরের রাগিনীর উন্মাদনায়
বেজে  ওঠে  নতুন সুরে।
আকাশের আকুলতা বাতাসের সমারহ
ছোয়া লাগায় মনের আনাচে কানাচে।
প্রেমে উচ্ছল মনটা বসন্তের বর্ণময় ছটায়
চিৎকার করে ডেকে ওঠে তুমি কোথায়?
ফাগুন প্রেম হেসে ওঠে কল্‌কলিয়ে
এইতো আমি আছি  জড়িয়ে   তোমায়,
অবগুণ্ঠন খুলে  দেখে নাও,
গভীর অন্তর স্থলে সে যে বলছে
আমি আছি আমি আছিতো।।

Tuesday, 14 February 2023

মধুর মিলন

মধুর মিলন 
পারমিতা চ্যাটার্জি 

আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে।  নবমিতা আপনমনে  হাসে। ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসের ফাঁকে বন্ধু দের  গল্প শোনে কার স্বামী  বা প্রেমিক কাকে কি দিয়েছে। নবমিতা প্রার্থনা করে  ওদের  এই হাসিখুশি মুখটা যেনো  চিরকাল  থাকে। ওর মতন যেনো হাসির আড়ালে বেদনাকে লুকিয়ে রাখতে না হয়। 
তার বিয়ে হয়ে গেছে। নামেই বিয়ে হয়েছে। ফুলশয্যার দিন তার স্বামী তাকে জানিয়ে দেয় যে এ বিয়েটা সে বাবা মায়ের ইচ্ছেতে করেছে, তাছাড়া আরও বলে সে তো অনেক ছোটো এতো ছোটো বয়েসে পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট থাকা সত্বেও সে কেনো বিয়ে করে নিলো, কেনো আরও পড়াশোনা করলোনা?  তার স্বামী তার থেকে আট বছরের বড়ো। ডক্টোরেট করে ইউনিভার্সিটির লেকচারার তাছাড়াও পোস্ট ডক্টরেট করছে। তার আন্ডারে  বেশ কিছু স্টুডেন্ট থিসিস করছে। হয়তো তার মনের মতন নিজের পছন্দের কেউ আছে। ফুলশয্যার রাতে ফুল দিয়ে সাজানো খাটে তার চোখ ভর্তি অশ্রু এসে যায় কোনো রকমে বলে আমাকে ছমাস সময় দিন  আমার এম এ পরীক্ষা টা হয়ে যাক তারমধ্যে আমি যেকোনো একটা চাকরি জোগাড় করে চলে যাবো। 
স্বামী অনিমেষ মানুষটা খুব ভদ্র এবং অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ সে তাড়াতাড়ি বলে তোমার সব দায়িত্ব আমার, তোমার কোনো অসুবিধা হবেনা,  শুধু স্বামী- স্ত্রী সম্পর্ক টা থেকে দূরে থাকবে সেদিন সে বলে আসলে আমি আর একজনের কাছে দায়বদ্ধ। 
নবমিতা অত্যন্ত অপমানিত হয়ে বললো এতো শিক্ষিত হয়ে আপনি শুধু বাবামায়ের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট করলেন? 
অনিমেষ তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরতে চাইলে সে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলেছিল দয়া করে আর অপমান করবেন না এমনিতেই আমি যথেষ্ট অপমানিত বোধ করছি। অনিমেষ বলেছিল সত্যি আমি খুবই দুঃখিত হয়তো একসাথে থাকতে থাকতে সময় সবকিছু ঠিক করে দেবে - 
কি ঠিক করবে সময়?  আজকের রাতটা একটা মেয়ের জীবনে কতোটা মূল্যবান আপনি জানেন না?  এই রাতটা কি আর ফিরে  আসবে?  তাছাড়া আমি একটু দূরে চাকরি নেবার চেষ্টা করবো যাতে সবার থেকে সরে গিয়ে একা নিজের মতন করে থাকতে পারি। 
নবমিতা দেখলো অনিমেষের দুচোখে একটা দুঃখ ভরা মমতা। নবমিতা একটা বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। কান্নার দমকে তার শরীরটা ফুলে ফুলে  উঠছিলো। সে অনিমেষ কে একথাও জানিয়ে দিয়েছে  যে অনিমেষের কোনো দয়ার দান চায়না নিজের খরচ সে নিজেই চালিয়ে নিতে পারবে। 
বিয়ের পরেরদিন একটা সাধারণ গোলাপি তাঁতের শাড়ি পড়ে তার মায়ের দেওয়া অল্প কিছু গহনা পরে ঘরের বাইরে এলো। বাইরে এসে দেখলো তার স্বামী অনিমেষ ও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে নবমিতা একটু অস্বস্তিতে পরে সেও জিজ্ঞাসু মুখে স্বামীর দিকে তাকালো নবমিতাকে বললো, এক মিনিট একটু দাঁড়াও আমি এখুনি আসছি। নবমিতা অবাক হয়ে ভাবলো আবার কি তাকে অপমানিত হতে হবে না কি!  কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখলো তার স্বামী একটা ক্যামেরা নিয়ে এসে বললো, তুমি খুব সুন্দর দেখতে কাল রাতে এতোটা বুঝতে পারিনি সাধারণ সাজ পোশাকে তোমাকে খুব মিষ্টি লাগছে। আমি ছবি তুলতে খুব ভালোবাসি তোমার একটা ছবি নেবো। বিস্মিত নবমিতা আরও অবাক হয়ে গেলো তার মনে পড়লো সত্যি কাল রাতে অনিমেষ তার মুখের দিকে ভালো করে তাকায়নি তাই সে হাত দিয়ে স্বামী কে থামিয়ে দিয়ে বললো একটা সম্পর্কহীন মানুষের ছবি তুলে তাকে আর অসম্মানিত করবেন না প্লিজ। 
অনিমেষ বুঝতে পারলো নবমিতার প্রচণ্ড আত্মসম্মান বোধ। নিজের কাছে নিজেই ছোটো হয়ে গেলো। 
নবমিতা একটা বাক্স নিয়ে শাশুড়ি মায়ের ঘরে দাঁড়িয়ে বললো, মা আসবো?  হ্যাঁ  হ্যাঁ নিশ্চয়ই এসো। শাশুড়ি বিভা দেবী  লক্ষ্য করলেন তার চোখ মুখ অত্যন্ত ফোলা আর খুব শুকনো তবুও তার রূপের মাধুর্যে তিনিও বলে ওঠলেন বাহ্ সকালে এই সাধারণ সাজে তোকে কি সুন্দর লাগছে রে!  কিন্তু চোখ মুখ এতো শুকনো কেনো?  নবমিতার চোখ দুটো জলে ভর্তি হয়ে উঠেছিল সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, মা এই গয়নাগুলো তোমার কাছেই রেখে দাও, এতো জিনিস আমি কোথায় হারিয়ে ফেলবো। বিভাদেবী যেনো কিছু বুঝতে পারলেন ওর থুতনি ধরে আদর করে বললেন এসব আমি তোকেই দিয়েছি রে মা আর  তোর ননদরা এবাড়ির আত্মীয় স্বজনরা সব তোকে ভালোবেসেই দিয়েছে তুই আমায় ফিরিয়ে দিচ্ছিস?  না মা ফিরিয়ে দিইনি আমি খুব অগোছালো তাই যদি হারিয়ে ফেলি তাই তোমার কাছে দিলাম আর তাছাড়া ---
তাছাড়া?  
এসবের যোগ্যতাও হয়তো আমার নেই। এই বলে সে ঘরের বাইরে যেতে গিয়ে দেখলো অনিমেষ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেলে অনিমেষ তাকে বললো, একটা কথা বলবো শুনবে? 
নবমিতা বললো, যা বলার বলে দিয়েছেন তো আর তো কিছু বলার নেই । অনিমেষ বললো আছে, অনেক কিছু বলার আছে সব একরাতের মধ্যে বলা সম্ভব হয় না। 
নবমিতা ওখান থেকে সরে এলো কারণ তার তখন কান্নায় গলা বুজে এসেছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে শাশুড়ির কাছে গিয়ে বললো, আমি কি চা করবো?  বিভাদেবী তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন আরে অষ্টমঙ্গলা টা যাক তারপর রান্নাঘরে ঢুকিস। কাল থেকে তো ভালো করে খাস নি, বল কি জলখাবার খাবি?  তাঁর শ্বশুর মশাই  অলকেশ বাবু বললেন আজ থেকে আমাদের মা এসে গেছে, মা যা মেনু ঠিক করবে তাই হবে। 
নবমিতা মুখ নামিয়ে নিয়ে বললো,  না না আমি কেনো? যা হবে তাই খাবো। একটু পরে কাজের মাসি আরতিদি ট্রে তে করে সবার জন্য চা বিস্কুট সাজিয়ে নিয়ে এলো। তার ননদরা আজ অবধি আছে সন্ধ্যা বেলায় সবাই চলে যাবে। প্রথমদিন মনে আছে ঢালাও লুচি তরকারি হলো আর ননদদের আবদারে অনিমেষ গরম বোঁদে নিয়ে এলো। 
এইভাবেই জীবন আরম্ভ হলো। তার কলেজ যাওয়ার সময় অনিমেষ তাকে গাড়ি করে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছিল সে ভিষণ ভাবে আপত্তি জানিয়ে বলেছিল আমি নিজেই যেতে পারবো। এখন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে প্রিয় বন্ধু নিবেদিতা তাকে দুটো টিউশন জোগাড় করে দিয়েছিল, সে টিউশন পড়িয়ে বাড়ি ফেরে। তাছাড়া গান তার প্রাণের জিনিস গানেও সে ডিপ্লোমা প্রাপ্ত তাছাড়া বহু নামকরা শিল্পীদের কাছে গান শিখতো, তাই দুটো গানের স্কুলেও চাকরি নিয়েছিল। শ্বশুর বাড়িতেও সকালে উঠে সকালের চা সবার জন্য জলখাবার বানিয়ে তারপর ইউনিভার্সিটির জন্য তৈরি হত। রাত জেগে পড়াশোনা করতো। এরমধ্যে লক্ষ্য করেছে তার স্বামীর অনেক পরিবর্তন। ক্রমশ যেনো তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। 
একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছে আর নবমিতার টিউশন পড়িয়ে  আসতে বেশ দেরি। বাসে খুব ভীড় তাই দু চারটে বাস ছেড়ে দিয়ে তবে অনেকক্ষণ পরে একটা বাস পায়। সত্যি কথা নবমিতার বাবার গাড়ি ছিল তার বাসে চড়ার অভ্যাস খুব একটা নেই তবু পরিস্থিতি মানুষকে সব অভ্যেসেই অভ্যস্ত করে তোলে। সেদিন তার বাস থেকে নেমে দেখে অনিমেষ অত্যন্ত উত্কণ্ঠা নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে নামতে দেখেই তাড়াতাড়ি তার হাত ধরে ছাতার তলায় নিয়ে এসে তার কাঁধ জড়িয়ে ধরে গাড়িতে ওঠায়। বাসস্ট্যান্ড থেকেও তার শ্বশুর বাড়িটা আরও কিছুটা দূরে। নবমিতা গাড়িতে বসে বললো আমার জন্য এতো কষ্ট করার দরকার ছিলোনা। অনিমেষ ওর দিকে একটা তোয়ালে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, বেশি কথা না বলে মাথাটা ভালো করে মুছে নাও একদম ভিজে গেছো তো কাল আবার জ্বর না এসে যায় । 
অনিমেষের এই চিন্তা বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে নবমিতা।  তাদের ঘরের লাগোয়া একটা ছোটো ঘর আছে, নবমিতা সেখানেই তার নিজের থাকার জায়গা করে নিয়েছে। রাত জেগে সে পড়ে বলে অনিমেষ প্রায় রোজই তাকে গরম কফি করে এনে দেয় আর নিজেও এককাপ খায় কারণ সেও রাত জেগে তার রিসার্চের কাজ করে। একএকদিন নবমিতাও দুজনের জন্য কফি করে নিয়ে আসে। গত দুদিন ধরে দেখছে তাকে জোর করে তার পড়ার টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে বসে কফি খেতে অনুরোধ করছে। সে বাপেরবড়ি গিয়ে দুদিন থাকতে না থাকতেই অনিমেষ গিয়ে উপস্থিত হয় আর তাকে নিয়ে আসে। নবমিতার মা মনে মনে হাসে আর বলে খুব বর সোহাগি দেখছি, মোটে ছেড়ে থাকতে পারেনা। নবমিতাও তার বাপেরবড়িতে তার জীবনের কথা গোপন রেখেছে। 
আজ সকালে সে চান করে এসে দেখে তার ছোটো ঘরের টেবিল আর ড্রেসিং টেবিলের ওপর অনিমেষ খুব সুন্দর ফুলদানিতে ফুল সাজিয়ে দিয়ে বলেছিল, ' হ্যাপি ভেলেনটাইনস ডে। 
আজ কলেজ থেকে বেরিয়ে দেখে অনিমেষ গাড়ি নিয়ে তার ইউনিভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, সে তো অবাক!  বন্ধু রা সব হেসে বলছে দেখ আজকের দিনে তোরা বর সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছে। নবমিতার লজ্জাও করলো আবার রাগও হলো কি দরকার এসব আদিখ্যেতার সত্যি টা তো আর এতে বদলে যাবেনা। সে গাড়ির কাছে এসে বললো, ' এ কি আপনি '!
হ্যাঁ আমি আজকের দিনে চলে এলাম আমার জীবনের সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট মানুষটাকে কিছু বলার জন্য। 
অনিমেষ গাড়ি চালিয়ে দিলো সোজা চলে গেলো বাসন্তি হাইওয়ে ধরে। নবমিতা আশ্চর্য হয়ে বললো আমরা কোথায় যাচ্ছি? 
অনিমেষ মুচকি হেসে উত্তর দিলো চলোই না ঠিক দেখতে পাবে। একটা সুন্দর রিসোর্টের কাছে এসে তাদের গাড়ি থামলো। অনিমেষ তার হাত ধরে নামিয়ে বললো, এসো - 
নবমিতা আরও অবাক হয়ে বললো, এখানে?  
আরে এসোই না --। 
নবমিতা পায়ে পায়ে স্বামীর পেছন পেছন গেলো অনিমেষ রিসেপশনের কাছে গিয়ে বলতেই, রিসেপশনিস্ট বললো, হ্যাঁ স্যার  আপনাদের ঘর রেডি আছে। 
ঘরে ঢুকে  অনেমেষ দুকাপ কফি আর কিছু স্ন্যাকসের অর্ডার করলো। তারপর নবমিতার হাতে একটা শাড়ির প্যাকেট দিয়ে বললো, এটা তোমার জন্য -- 
আমার জন্য ?  কেনো?  
খুলেই দেখোনা পছন্দ কি না? 
নবমিতা দেখলো একটা হালকা গোলাপি রঙের আগাগোড়া চিকনের কাজ করা খুব সুন্দর একটা শাড়ি । 
অনিমেষ ওর কাছে বসে ওর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে বললো, পছন্দ? 
হ্যাঁ পছন্দ তো বটেই কিন্তু হঠাৎ আমার জন্য কেনো সেটাই বুঝতে পারছিনা? 
বুঝবে আসলে তুমি সব কিছুই একটু দেরিতে বোঝ বা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাওনা, 
মানে? 
মানে এইযে প্রথম রাতের কথাটাই ধরে রেখে দিয়েছো আর আমি যে তোমাকে এতোটা ভালোবেসে ফেলেছি সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইছোনা। 
নবমিতা সত্যি হাঁ করে বসে থাকলো, তার বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখদুটো জলে প্রায় ভরে এসেছে, অনিমেষ কাছে এসে দু'হাতের তালুতে তার মুখটা তুলে ধরে বললো, তোমার মতন এতো সুন্দর শান্ত স্নিগ্ধ একটা মেয়েকে ভালো না বেসে থাকা যায়?  তার কপালে এই প্রথম একটা ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিলো। নবমিতা দুহাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো আর অনিমেষ তাকে দুই বাহু দিয়ে বুকের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো, কাঁদেনা, অনেক কেঁদেছো এবার থেকে আমরা শুধুই হাসবো কেমন?  আর তোমাকে কাঁদবার কোনো সুযোগ দেবোনা। এরপর দুজনে নিভৃতে এক অপরূপ ভালোবাসার মিলনে হারিয়ে গেলো। 
নবমিতা মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে বললো, তুমি খুব খুব বাজে,
অনিমেষ ওকে আরও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করে বললো,  হ্যাঁ আমি সত্যি খুব বাজে কিন্তু আমি তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি।

Sunday, 12 February 2023

মনকলি ৪ র্থ পর্ব

মনকলি পর্ব ৪
পারমিতা চ্যাটার্জি 


পরের দিন মনকলির প্রথম জয়েনিং। মনে মনে ভিষণ টেনশন। যাই হোক সময় মতন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে চলে গেলো কলেজের দিকে। 
বলরামপুর কলেজে পৌঁছে প্রথমে তাকে টিচার্সদের কমন রুমে বসতে দেওয়া হয়, একজন ক্লার্ক নির্মল নামে তাকে বললো, এখানে বসুন আপনি ভাইসপ্রিন্সিপাল সাহেব এলে আপনাকে ডেকে নেবো। বসে থাকতে থাকতেই কলেজের লেকচারারদের সাথে পরিচয় হয়ে যায়।ওদের কাছেই জানতে পারে রাহুল স্যার মানে ভাইস প্রিন্সিপাল সাহেব খুব ভালো মানুষ। তাদের কালচারাল ফাংশনে উপস্থিত থাকেন এবং খুব উত্সাহ দিয়ে থাকেন। 
মনকলির মনে কেমন একটা খটকা লাগলো। যাইহোক দুরুদুরু বুকে ডাকের অপেক্ষায় বসে আছে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতো হলো না। একটু পরেই নির্মল বলে ছেলেটা এসে তাকে নিয়ে গিয়ে ভাইস প্রিন্সিপালের রুমের সামনে দিয়ে এসে বললো - যান, আপনাকে ডাকছেন স্যার। 
মনকলি ভেজানো দরজা খুলে মুখ নীচু করেই বললো, আসবো স্যার? 
- হ্যাঁ আসুন বলেই মুখ তুলেই চমকে উঠলেন রাহুল শাউ, তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, বসুন। 
আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দিন। 
মনকলিও কম ঘাবড়ে যায়নি, সে ও নিজেকে সামলে নিলো। অয়েন্টমেন্ট লেটারটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে যেনো একটু কেঁপে গেলো, রাহুল তার সেই কাঁপুনিটা লক্ষ্য করলো কিন্তু মুখে কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিলো শুধু  তারপর নিজের সই সাবুদ যা কারার করে বললো নির্মল আপনাকে রুটিন দিয়ে দেবে। আজ প্রথম দিন ওই ক্লাসে পৌঁছে দেবে।
কাঁপা গলায় মনকলি বললো, আমার যে অনেক কথা ছিলো, 
আমার তো আর কারুর সাথে কোনো কথা নেই। এখানে নতুন কেউ এলে সবসময় একটা ওয়েলকাম সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়, হল ঘরে প্র্যাকটিস চলছে, আপনি ইচ্ছে করলে ওখানেও যেতে পারেন। আমাকে একটু বেরোতে হবে, দুতিনদিনের জন্য শান্তিনিকেতন যাচ্ছি আমার এক বন্ধুর কাছে। আশাকরি আপনার কোনো অসুবিধা হবেনা, বলে হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বললো কলেজটাকে আপন করে নিতে হবে, হ্যাঁ ভালোবেসে পড়াতে হবে দেখবেন সবাই আপনাকে ও কতো আপন করে নেবে। লাল মাটির মানুষরা বড়ো সরল আর সাদাসিধা হয়।বলেই ফোনে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন, মনকলি বেরিয়ে আসার সময় শুনতে পেলো বউয়াদা বলছে, সুচরিতা, আমি বউয়াদা বলছি, আজই পৌঁছে যাচ্ছি শান্তিনিকেতনে আর রাতের খাবারটা তোমার কাছেই  খাবো। 
আরও কথা বলে যাচ্ছে, ওপাশ থেকেও হয়তো উত্তর আসছে। মনকলি একদম ভেঙে পড়লো, মনে মনে বললো, তুমি এভাবে আমাকে ভুলে গেলে!  এতো দূরে সরিয়ে দিলে, আমার কথাটা শুনলেও না একবার। 
সত্যি বউয়ার কোনো আবেগ এলোনা, এতোদিন পরে তার প্রথম জীবনের ভালোবাসাকে চোখের সামনে দেখেও। 
তবে কি সত্যি সেদিনের বউয়াদা আর আজকের রাহুলের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। না কি প্রতিশোধ নেবার প্রবল ইচ্ছা। নিজেকেই প্রশ্ন করে যাচ্ছে রাহুল। 
গাড়ি হু হু করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার  দু'ধারে  সবুজ গাছের সারি, তাল তমালের অরণ্য। তারই রাস্তায় লাল সিমূলে ভরা পাতাবিহীন গাছ, মাঝখানে পলাশ ফুলের  লাল রঙ  উঁকি  মারছে সবুজ পাতার মাঝে বসে। 
কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া দুলছে বসন্তের হাওয়ায়, রাহুলের মনটাও দোদুল্যমান এই ভরা বসন্তের আগমনে। সত্যি সে কাকে ভালোবাসে?  যে তাকে খুব বাজে ভাবে অপমান করে একদিন ফিরিয়ে দিয়ে উচ্ছল জীবনের  হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিল। ফিরে তাকায়নি একবার ছোটবেলা থেকে একসাথে বড়ো হয়ে ওঠা একজনের মুখের কথা আর একজন সে ও বাল্য সখি নিস্তব্ধে নীরবে তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে, চেষ্টা করেও পারছেনা জীবনের দরজাটা অন্যকারও জন্য খুলে দিতে। 
হ্যাঁ তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যতা হয়তো   সন্ধ্যাবেলার নিভু নিভু দীপ শিখার মতন। কিম্তু ভালোবাসায় ভরপুর, সেই স্নিগ্ধ শান্ত সৌন্দর্য  তার চোখের আকুলতাকে বার বার ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উচ্ছল ঝর্ণার দিকে না এগোনই ভালো। যে ঝর্ণার পাথুরে আঘাতে তার মন একদিন ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।। 
তার এই ভাবনার  মাঝেই এসে গেলো বর্ধমান। 
একটু এগিয়ে  একটা মিষ্টি দোকানে বসে গরম সিঙারা কচুরি আর ল্যাংচা খেয়ে নিল। কিছু ল্যাংচা সুচরিতার জন্য কিনে নিলো। ভালোবাসার এই টানাপোড়েনে আজ সুচরিতার স্থান তার জীবনে সত্যি পাকা হয়ে গেছে। 
ক্রমশ 


Thursday, 9 February 2023

অসহায়

অসহায়
অনু গল্প
পারমিতা চ্যাটার্জী 

কদিন অসুখে ভুগে বড় কাহিল হয়ে পড়েছে চৈতী, আজ তবু যেন একটু ভালো লাগছে।
কাজের মেয়ে রুমা এসে জোড় করে দুটো ভাত খাইয়ে গেল, এই খাওয়াটার ধকলে সে কাহিল হয়ে পড়েছে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে লেখার খাতাটা হাতে তুলে নিল।
একটু পড়ে তার স্বামী সুব্রত ঘরে ঢুকল, আজ কদিন পর সে বাড়ী ফিরল, চৈতীর অসুখের সময়টা সে বাইরে ছিল, বেড়াতে গিয়েছিল।
ঘরে ঢুকেই স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, একটু খেতে পারলে? শরীরটা কেমন আজ? চৈতী এতো প্রশ্নের কোন উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করলনা, সে পাল্টা প্রশ্ন করল, তারপর তোমার বেড়ানো কেমন হল? সুব্রত বলল আজকাল আর ভালো লাগেনা বুঝলে, এই সবাই এতো  করে ধরল, আর আমিও লোকের কথা ফেলতে পারিনা তো, যাক্ তুমি বিশ্রাম কর আমিও একটু শুয়েনি বুঝলে, কদিন বেশ ধকল গেল, সে একটা ফ্যান্সি ব্যাগ স্ত্রীর সামনে রেখে বলল, তোমার জন্য এনেছিলাম। চৈতী ব্যাগটা দেখে বলল, ভালো হয়েছে, না মানে তুমি এদিক ওদিক যাওতো তাই ভাবলাম...।
চৈতীর খুব হাসি পেল, অসুস্থ স্ত্রীকে ছেড়ে বেড়াতে যাবার অছিলা ঢাকতে কতরকম অজুহাত খারা করছে, পারেও মানুষটা, সুব্রত থাকল বা না থাকল তাতে যে সত্যি চৈতীর কিছু এসে যায়না একথা সুব্রত বুঝেও বুঝতে চয়না।
কদিন পর চৈতী সুস্থ হয়ে উঠেছে বেশ অনেকটা, আবার নিজের কাজের জায়গায় ফিরে এসেছে, আগামী কাল এন জি ওর একটা কাজে সুন্দরবন যাবার সব ব্যাবস্থা হয়েছে, ক জন মিলে তারা যাবে, একটা গাড়ী বুক হয়েছে।
বিকেলে সুব্রত ফিরল, অফিস থেকে বেশ শরীর খারাপ নিয়ে, চৈতী ডাক্তার ডাকল, অসুধ পত্র সব আনিয়ে দিল, তারপর সুব্রতর কাছে জানতে চাইল, কাল কি আমি যাব? সুব্রত বলল হ্যাঁ হ্যাঁ যাও, রুমাকে একটু শুধু সব বুঝিয়ে দিয়ে যাও,   চৈতী বলল,  হ্যাঁ আমি সব ব্যাবস্থা করে যাব।
পরদিন সব গুছিয়ে নিজে তৈরী হয়ে চৈতী সুব্রতর কাছে এসে দাঁড়াল, এই দেখ তোমার প্রেসক্রিপসন রয়েছে সামনেই রাখলাম অসুধগুলো সব নিয়ম করে খেও, যা খেতে ইচ্ছে করবে রুমাকে বোল করে দেবে, আর বিকেলে আবার ডাক্তার আসবে, যা অসুবিধে সব ঠিক করে জানিও।
চৈতী দেখল সুব্রত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, চৈতী কাছে এসে বলল, আমি আসছি তাহলে, সুব্রত হঠাৎ  বলে উঠল তুমি সত্যি যাচ্ছ?
হ্যাঁ তুমি তো বললে, তাছারা বেশী শরীর খারাপ হলে ডাক্তারকে ফোন করে দিও, তাছাড়া তোমার তো ক্লাবের লোকজন অনেক আছে, ওদের না হয় কাউকে ডেকে নিও,  সবাই নিজের কাজে ব্যাস্ত,  কেউ আসবেনা, আসবে আসবে,  ঠিক আসবে তুমি সব সময় ওদের কথা চিন্তা কর আর ওরা আসবেনা, তা কি হয়? সুব্রত করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, পৃথিবীতে কেউ কারো নয়, চৈতী বলল, ঠিক আসবে যাদের জন্য সব সময় দৌড়ে বেড়াও তারা আসবেনা তা কি করে হয়? আমার সাথে আর কতটুকু থাক, আমি আসছি।
চৈতী চলে গেল, আজ সুব্রতর প্রথম মনে হল চৈতীকে সত্যি হারিয়ে ফেলেছে, কর্তব্যের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখত তাই বুঝতে পারেনি, আজ সেই আড়ালটুকু ভেঙে দিল, তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল,  প্রথম নিজেকে খুব অসহায় লাগল।

Tuesday, 7 February 2023

মনকলি ৩য় পর্ব।

মনকলি তৃতীয় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি 


পুরুলিয়ার রুখু মাটির লাল রাঙামাটির পথের সাথে একাত্ম হয়ে গেছেন অধ্যাপক রাহুল শাউ। 
আগে নাম ছিলো রাজকুমার, এখন নিজের নাম নিজেই এভিডেভিড করে রেখেছেন রাহুল। 
রাজকুমার নামটা তার কোনদিনই পছন্দের ছিলোনা, তার মা তাঁকে ডাকতেন রাহুল বলে, সেই নামটাই এখন ব্যবহার করেন। 
আজ ছুটির দিন তাই বেড়াতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা পাহাড়ে, পাহাড়ের সৌন্দর্য, লাল পলাশের বন,রাঙামাটির পথ আর অজস্র নাম না জানা পাখির ডাক, গাছগাছালির মধ্যেই যত্নে রেখে দেন তার নিজস্ব এক বেদনাকে। এ বেদনার কথা কেউ জানেনা,  এ বেদনা এক না পাওয়ার বেদনা, যা তার একান্ত নিজস্ব গোপন এক কুঠুরিতে সযত্নে রেখে দেন। 
কেউ বোঝেনা সদা হাস্যময় মানুষটির জীবনের অন্দরে গোপনে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে, শুধু যে না পাওয়ার বেদনা তা তো নয় তার সাথে আছে এক অকারণ নিষ্ঠুর অপমানের ঘা। এখনও যেনো পরিস্কার শুনতে পান সেই অহংকারী কণ্ঠ, " তুমি কি আমার যোগ্য নাকি যে আমাকে এই প্রস্তাব দিতে এসেছো "! শুধু প্রত্যাখ্যান হলে হয়তো এতোটা কষ্ট পেতেননা যদি না তার সাথে এই নিষ্ঠুর অপমান টা থাকতো। ভুলে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু ভুলতে পারলেন কই?
এসে পৌঁছোলেন নিজের বাগানঘেরা ছোটো বাড়টিতে। মনের মতন করে সাজানো বাসা, সামনে একফালি জমিতে ছোটো বাগান, গেটের দু'ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছ,  মাঝখান দিয়ে লালমাটির রাস্তা, রাস্তার দু'ধারে নানান ধরনের ফুলের গাছ বাগান আলো করে আছে। সবুজ ঘাসের জমিতে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী লাখুয়া সবজির বাগান  করেছে। সামনে ছোটো গোল বারান্দায় উঠে গেছে পাতাবাহারের ঝার। দুটো বেতের চেয়ার আর একটি বেতের টেবিল দিয়ে সাজানো কাঁচঘেরা চারচৌকা বারন্দা। বেতের চেয়ারে বসে তারা গুনতে গুনতে, ঝিঁঝি পোকার ডাক, জোনাকের আলো আর দূর পাহাড়ের গা থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণার ঝিরিঝিরি শব্দ শুনতে শুনতে রাতগুলো কেটে যায়। 
লাখুয়া বাবুকে আসতে দেখে একবাটি চিঁড়ে ভাজা আর গরম ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এসে হাজির করলো। 
মলিন হেসে বললেন অধ্যাপক রাহুল, ' তুই ঠিক জানতে পারিস না, আমি কখন ফিরলাম '?  
- হ বাবু জানতি পারি, বাহিরে তো কুছু খাবেকটো লাই, সেই কুন সকালে দুটো রুটি আর একটু সবজি খাইছো, খিদেক লাগেনি তুমার? 
- হ্যাঁ লাগে, খাই তো, খাই না কে বললো!  টোস্ট খাই, ডিম সিদ্ধ খাই, ফল খাই, আবার কি লাগে রে!  টকদইও তো খাই, একটা মানুষের আর কতো খাবার লাগে বল?  
সত্যি খুব পরিমিত আহার করেন রাহুল, জীবনধারণের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকই খান, লাখুযা জোরজার করে খাওয়ায় তাকে। আজ খুব অন্যমনস্ক লাগছে রাহুলকে, আজ বেশ কয়েকদিন পর সুচরিতা কে ফোন করেছিলেন, বড়ো ভালো মেয়েটি, সুচরিতা তাকে সত্যি ভালোবাসে, বাইরের চাকচিক্যের প্রতি ওর কোনো মন টানেনা, যা মনকলিকে টানতো। সুচরিতা একজন সত্যিকারের মানুষ চায়। আজ রাহুল একটু অভিমানের সুরেই বলেছিল, ' একটা ফোন করেও আমার খবর নাওনা, আমি না ফোন করলে তো কথাই হয়না ', 
একটু চুপচাপ হয়ে সুচরিতা উত্তর দিলো, যাকে ভালোবাসি সে যদি নিজেকে দাদা বলে দূরে সরিয়ে রাখে তাহলে কি কথা বলবো বলো!  আমি যে তোমাকে ভালোবাসি বউয়াদা, আর এই কথাটা আমার কাছে খুব সত্যি, তাই তোমাকে দাদা বললে ঠকানো হবে, নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা ছাড়া আর উপায় কি বলো! 
- তুমি সত্যি বলছো! তুমি আমায় ভালোবাসো?  কিন্তু কেনো,  আমি যে খুব সাধারণ মানের জীবনযাপনে অভ্যস্ত সুচরিতা, বাবার সম্পত্তি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি দাদাদের কাছে, বিদেশে পড়াবার সুযোগ পেয়েও যাইনি, এই রাঙামাটির দেশই যে আমার স্বর্গ, এতো সাধারণ জীবন যাপন করতে গিয়ে একসময় ক্লান্ত হয়ে যাবে। মাটি, পাহাড়, আর জঙ্গলের নির্জনতা তোমাকে অবসাদ গ্রস্ত করে তুলবে,
- না বউয়াদা তুমি সাধারণের মধ্যেও একজন অসাধারণ মানুষ, আমি সেই প্রকৃত মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি তোমার মধ্যে, যাক সে কথা একা আমার ভালোবাসায় তো হয়না, আমি জানি তোমার মন অন্য কোথাও বাঁধা আছে, সেও তোমাকে খুঁজছে, হয়তো পৌঁছে যাবে খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে, 
অবাক হয়ে বললো রাহুল, মানে তুমি কার কথা বলছো, যাকে মনে রেখে কোনদিন কাউকে ভালোবাসতে পারোনি, আমি তোমার মনকলির কথা বলছি, মনকলির ডিভোর্স হয়ে গেছে, আমার এখানে এসেছিল  ছ সাত মাস আগে তোমার খোঁজে, আমি বলেছিলাম তুমি পুরুলিয়ায় আছো জানি কিন্তু কোথায় আছো জানিনা, তখনও তুমি আমাকে ফোন কর নি তো তাই তোমার ঠিকানা আমি সত্যি জানতাম না। 
রাহুল একটু থেমে বলেছিল, সুচরিতা তোমাকে একটা কথা বলবো? 
- হ্যাঁ বলো না, 
- তোমাকে আমি বলে এসেছিলাম যে আমার মনে অন্য কেউ আছে, কিন্তু আজ তোমার কাছ থেকে এখানে চলে আসার পর মনে হচ্ছে, তোমার চেয়ে আপন আমার আর কেউ নেই, যে শুধু আমি মানুষটাকে চিনেছে বুঝেছে, 
- তুমি সত্যি বলছো বউয়াদা? 
- হ্যাঁ সুচরিতা আমি তোমাকে সত্যি কথাই বলছি। হ্যাঁ ভালো কথা শোন, এখানে বলরামপুরের একটা কালচারাল ক্লাব আছে, আর কালচারাল ক্লাব মানেই তো আমি, তুমি জানো সেটা? 
- হ্যাঁ এও জানি তোমার সাথে আর একজনও থাকতো কিন্তু, 
- থাকতোওওওও, এখন সেটা অতীত হয়ে গেছে, আমরা বর্তমান নিয়েই ভাবি, আজ এখন আমার সাথে যে আছে তার কথাই ভাবা যাক, তুমি গাইবে সুচরিতা? 
- তুমি বললে আমি না করতে পারিনা বউয়াদা, তুমি জানো সেটা, কিন্তু মুসকিল হচ্ছে পুরুলিয়া অবধি না হয় আমি চলে গেলাম তারপর স্টেশন থেকে আমাকে নিয়ে আসতে হবে,  
- আরে নিশ্চয়ই, আমি তো ভাবছিলাম পরশু আমার দুটোর পর কোনো ক্লাস নেই ফ্রি আছি, তুমি যদি ফ্রি থাকো জানিও আমাকে তাহলে আমি একদিনের জন্য শান্তিনিকেতনে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবো, অনেকদিন যাই নি কবিগুরুর দেশে মনটা টানছে খুব একবার যাবার জন্য, তুমি আসবে তো সুচরিতা আমার সাথে কদিনের জন্য? 
- হ্যাঁ যাবো তবে কদিন ছুটি পাবো সেটা একটু দেখে নিতে হবে, 
ঠিক আছে তাই হবে। 
ক্রমশ