Tuesday, 7 February 2023

মনকলি ৩য় পর্ব।

মনকলি তৃতীয় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি 


পুরুলিয়ার রুখু মাটির লাল রাঙামাটির পথের সাথে একাত্ম হয়ে গেছেন অধ্যাপক রাহুল শাউ। 
আগে নাম ছিলো রাজকুমার, এখন নিজের নাম নিজেই এভিডেভিড করে রেখেছেন রাহুল। 
রাজকুমার নামটা তার কোনদিনই পছন্দের ছিলোনা, তার মা তাঁকে ডাকতেন রাহুল বলে, সেই নামটাই এখন ব্যবহার করেন। 
আজ ছুটির দিন তাই বেড়াতে গিয়েছিলেন অযোধ্যা পাহাড়ে, পাহাড়ের সৌন্দর্য, লাল পলাশের বন,রাঙামাটির পথ আর অজস্র নাম না জানা পাখির ডাক, গাছগাছালির মধ্যেই যত্নে রেখে দেন তার নিজস্ব এক বেদনাকে। এ বেদনার কথা কেউ জানেনা,  এ বেদনা এক না পাওয়ার বেদনা, যা তার একান্ত নিজস্ব গোপন এক কুঠুরিতে সযত্নে রেখে দেন। 
কেউ বোঝেনা সদা হাস্যময় মানুষটির জীবনের অন্দরে গোপনে রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে, শুধু যে না পাওয়ার বেদনা তা তো নয় তার সাথে আছে এক অকারণ নিষ্ঠুর অপমানের ঘা। এখনও যেনো পরিস্কার শুনতে পান সেই অহংকারী কণ্ঠ, " তুমি কি আমার যোগ্য নাকি যে আমাকে এই প্রস্তাব দিতে এসেছো "! শুধু প্রত্যাখ্যান হলে হয়তো এতোটা কষ্ট পেতেননা যদি না তার সাথে এই নিষ্ঠুর অপমান টা থাকতো। ভুলে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু ভুলতে পারলেন কই?
এসে পৌঁছোলেন নিজের বাগানঘেরা ছোটো বাড়টিতে। মনের মতন করে সাজানো বাসা, সামনে একফালি জমিতে ছোটো বাগান, গেটের দু'ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছ,  মাঝখান দিয়ে লালমাটির রাস্তা, রাস্তার দু'ধারে নানান ধরনের ফুলের গাছ বাগান আলো করে আছে। সবুজ ঘাসের জমিতে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী লাখুয়া সবজির বাগান  করেছে। সামনে ছোটো গোল বারান্দায় উঠে গেছে পাতাবাহারের ঝার। দুটো বেতের চেয়ার আর একটি বেতের টেবিল দিয়ে সাজানো কাঁচঘেরা চারচৌকা বারন্দা। বেতের চেয়ারে বসে তারা গুনতে গুনতে, ঝিঁঝি পোকার ডাক, জোনাকের আলো আর দূর পাহাড়ের গা থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণার ঝিরিঝিরি শব্দ শুনতে শুনতে রাতগুলো কেটে যায়। 
লাখুয়া বাবুকে আসতে দেখে একবাটি চিঁড়ে ভাজা আর গরম ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এসে হাজির করলো। 
মলিন হেসে বললেন অধ্যাপক রাহুল, ' তুই ঠিক জানতে পারিস না, আমি কখন ফিরলাম '?  
- হ বাবু জানতি পারি, বাহিরে তো কুছু খাবেকটো লাই, সেই কুন সকালে দুটো রুটি আর একটু সবজি খাইছো, খিদেক লাগেনি তুমার? 
- হ্যাঁ লাগে, খাই তো, খাই না কে বললো!  টোস্ট খাই, ডিম সিদ্ধ খাই, ফল খাই, আবার কি লাগে রে!  টকদইও তো খাই, একটা মানুষের আর কতো খাবার লাগে বল?  
সত্যি খুব পরিমিত আহার করেন রাহুল, জীবনধারণের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকই খান, লাখুযা জোরজার করে খাওয়ায় তাকে। আজ খুব অন্যমনস্ক লাগছে রাহুলকে, আজ বেশ কয়েকদিন পর সুচরিতা কে ফোন করেছিলেন, বড়ো ভালো মেয়েটি, সুচরিতা তাকে সত্যি ভালোবাসে, বাইরের চাকচিক্যের প্রতি ওর কোনো মন টানেনা, যা মনকলিকে টানতো। সুচরিতা একজন সত্যিকারের মানুষ চায়। আজ রাহুল একটু অভিমানের সুরেই বলেছিল, ' একটা ফোন করেও আমার খবর নাওনা, আমি না ফোন করলে তো কথাই হয়না ', 
একটু চুপচাপ হয়ে সুচরিতা উত্তর দিলো, যাকে ভালোবাসি সে যদি নিজেকে দাদা বলে দূরে সরিয়ে রাখে তাহলে কি কথা বলবো বলো!  আমি যে তোমাকে ভালোবাসি বউয়াদা, আর এই কথাটা আমার কাছে খুব সত্যি, তাই তোমাকে দাদা বললে ঠকানো হবে, নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা ছাড়া আর উপায় কি বলো! 
- তুমি সত্যি বলছো! তুমি আমায় ভালোবাসো?  কিন্তু কেনো,  আমি যে খুব সাধারণ মানের জীবনযাপনে অভ্যস্ত সুচরিতা, বাবার সম্পত্তি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছি দাদাদের কাছে, বিদেশে পড়াবার সুযোগ পেয়েও যাইনি, এই রাঙামাটির দেশই যে আমার স্বর্গ, এতো সাধারণ জীবন যাপন করতে গিয়ে একসময় ক্লান্ত হয়ে যাবে। মাটি, পাহাড়, আর জঙ্গলের নির্জনতা তোমাকে অবসাদ গ্রস্ত করে তুলবে,
- না বউয়াদা তুমি সাধারণের মধ্যেও একজন অসাধারণ মানুষ, আমি সেই প্রকৃত মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি তোমার মধ্যে, যাক সে কথা একা আমার ভালোবাসায় তো হয়না, আমি জানি তোমার মন অন্য কোথাও বাঁধা আছে, সেও তোমাকে খুঁজছে, হয়তো পৌঁছে যাবে খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে, 
অবাক হয়ে বললো রাহুল, মানে তুমি কার কথা বলছো, যাকে মনে রেখে কোনদিন কাউকে ভালোবাসতে পারোনি, আমি তোমার মনকলির কথা বলছি, মনকলির ডিভোর্স হয়ে গেছে, আমার এখানে এসেছিল  ছ সাত মাস আগে তোমার খোঁজে, আমি বলেছিলাম তুমি পুরুলিয়ায় আছো জানি কিন্তু কোথায় আছো জানিনা, তখনও তুমি আমাকে ফোন কর নি তো তাই তোমার ঠিকানা আমি সত্যি জানতাম না। 
রাহুল একটু থেমে বলেছিল, সুচরিতা তোমাকে একটা কথা বলবো? 
- হ্যাঁ বলো না, 
- তোমাকে আমি বলে এসেছিলাম যে আমার মনে অন্য কেউ আছে, কিন্তু আজ তোমার কাছ থেকে এখানে চলে আসার পর মনে হচ্ছে, তোমার চেয়ে আপন আমার আর কেউ নেই, যে শুধু আমি মানুষটাকে চিনেছে বুঝেছে, 
- তুমি সত্যি বলছো বউয়াদা? 
- হ্যাঁ সুচরিতা আমি তোমাকে সত্যি কথাই বলছি। হ্যাঁ ভালো কথা শোন, এখানে বলরামপুরের একটা কালচারাল ক্লাব আছে, আর কালচারাল ক্লাব মানেই তো আমি, তুমি জানো সেটা? 
- হ্যাঁ এও জানি তোমার সাথে আর একজনও থাকতো কিন্তু, 
- থাকতোওওওও, এখন সেটা অতীত হয়ে গেছে, আমরা বর্তমান নিয়েই ভাবি, আজ এখন আমার সাথে যে আছে তার কথাই ভাবা যাক, তুমি গাইবে সুচরিতা? 
- তুমি বললে আমি না করতে পারিনা বউয়াদা, তুমি জানো সেটা, কিন্তু মুসকিল হচ্ছে পুরুলিয়া অবধি না হয় আমি চলে গেলাম তারপর স্টেশন থেকে আমাকে নিয়ে আসতে হবে,  
- আরে নিশ্চয়ই, আমি তো ভাবছিলাম পরশু আমার দুটোর পর কোনো ক্লাস নেই ফ্রি আছি, তুমি যদি ফ্রি থাকো জানিও আমাকে তাহলে আমি একদিনের জন্য শান্তিনিকেতনে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবো, অনেকদিন যাই নি কবিগুরুর দেশে মনটা টানছে খুব একবার যাবার জন্য, তুমি আসবে তো সুচরিতা আমার সাথে কদিনের জন্য? 
- হ্যাঁ যাবো তবে কদিন ছুটি পাবো সেটা একটু দেখে নিতে হবে, 
ঠিক আছে তাই হবে। 
ক্রমশ

No comments: