পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প
মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে।
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি? কি বলে ডাকবো তোমায়?
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো, উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়? দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি?
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই,
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি?
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে।
মনকলির মনটা কেমন যেনো আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে! তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে।
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি?
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে?
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ! খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি।
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো,
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে,
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো?
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো,
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো?
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও,
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক।
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন?
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে।
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়, নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment