Monday, 30 January 2023

প্রেম এসেছিল

Paromita creationপ্রেম এসেছিল
পারমিতা চ্যাটার্জি 

যে প্রেম এসেছিল সেদিন,
সে প্রেম তো তোমার নয়,
তবে কেন অন্ধকারে হাতড়ে  বেড়াও তাকে?
সেদিন আকাশে ছিলনা চাঁদের আলো,
ঘন মেঘের কালো ছায়ায় ঢাকা
নিবিড় তিমির আকাশটা 
হেসে উঠেছিল ব্যাঙ্গের হাসি।
বোঝনি তুমি সেই ছলনা,
উচ্ছলিত উদ্‌বেলিত ঝর্ণার মতোন তোমার প্রেম
বয়ে চলছিল পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেতে খতে,
ডুবন্ত মনটা খুঁজে ফিরছিল
একফালি সবুজ মাটি,
তুমি পারোনি দিতে।
 
   আজ দেখো   আকাশে কত তারার মালা,
গাছ ঢাকা দিঘির জলে কাঁপছে পূর্ণিমার চাঁদের ছায়া,
তুমি চাইছো আসতে কাছে,
দুহাত দিয়েছ বাড়িয়ে,
চাঁদ তবু এলোনা কাছে
শূণ্য বাতায়নের রুদ্ধ কবাট
গেলোনা খুলে তোমার আওহ্বানে।

Saturday, 28 January 2023

পারমিতা ক্রিয়েশনস

মনকলি ২য় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প

মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 
মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে? 
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  
ক্রমশ

মনকলি --২ য় পর্ব

Paromita creationমনকলি ২য় পর্ব
পারমিতা চ্যাটার্জি
বড়ো গল্প

মনকলির বাড়িটা পেয়েছে খুব সুন্দর। খোলা জানলা দিয়ে নীল আকাশ যেনো নুয়ে পড়েছে রাঙা মাটির পথের ধারে। আদিবাসীর স্ত্রী পুরুষেরা রাঙামাটির পথ দিয়ে যাতায়াত করে। দু'ধারে ঝুঁকে পড়েছে লালপলাশের বন। অযোধ্যা পাহাড় একটু দূরে, মেঘের মাঝে আবছায়া দেখা যায় মাঝে মাঝে। আদিবাসী একটি মেয়ে তার বাড়ির কাজের জন্য ঠিক হয়েছে, কালো শরীরে ভরাট যৌবন, মুখে একটা সরলতা, সব মিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ চটকদারই লাগে। 
মনকলি ওকে জিজ্ঞেস করে, ও মেয়ে তোমার নাম কি?  কি বলে ডাকবো তোমায়? 
মেয়েটি একমুখ সরল হাসি হেসে বললো,  উ দিখো, মুর আবার লাম, উ যি যা পারে তা বলি ডাক দেয়, মুর মরদটা তো ঘরকে ঢুকেই চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে অহন, আরে এই তু গেলি কুথায়?  দাঁড়া ফের তুয়ার চ্যালাকাঠের বাড়ির খাওনের সখ গ্যাছে লাকি রে?  
মনকলি অবাক হয়ে বলে, সে কি চ্যালা কাঠের বাড়ি দেয় নাকি? 
- হ হ উ আমাদের সব মরদরাই দ্যায়, আবার এতের বেলায় সুহাগটা করে, সূয্যি উঠলেই গাল পারে, পান্তা খেইয়ে কামটায় যায়, সাঁঝের বেলটায় ঘরকে হাঁড়িয়া খাইয়ে ঢুকেই চিল্লাতে থাকে। উ আমাদিগের সয়ে গেছে রে দিদি। তবে বাপ মা ইকটা লাম দিয়াছিল বটেক, চম্পা বইল্যে ডাকতক, আর এহনে মুকে বুধনের মা বলে সোবাই, 
তোমার ছেলের নাম বুধন বুঝি? 
- হ দিদি, ইসকুলে পড়তে পাঠাইসি, তার লগে বুধনের বাপ আমারে এমন মারছিল যে মুর কোন সার ছিলো না, হাসপাতালটায় লিয়ে গিয়েছিল, উখানে ডাক্তার বাবুরা বলছে উয়াকে আর যদি মারো উয়াকে তু পুলিশে দিমু, একমুখ হেসে বলে আর মুর গায়ে হাত তুলে লাই, বলেক আমি ভাবছিলাম তু আর বাঁচবিনা, তুয়াকে ছেইরে মু তো বাঁইচতে পারবক লা, বুধনের কি হইবেক, অহন আমারে খুব ভালোবাসে, মেলা বসলে, মুর লগি কাঁচের চুড়ি, পুঁথির মালাটা লিয়ে আসে। 
মনকলির মনটা কেমন যেনো  আনমনা হয়ে যায়, সে হয়তো চ্যালাকাঠের বাড়ি খায়নি, কিন্তু তার চেয়ে আরও অনেক বড়ো মার খেয়েছে জীবনে, বউয়াদাকে খুঁজে পাবে!  তার মনে দোলাচল চলতে থাকে। যে মানুষটাকে একদিন অবহেলায় জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, আজ তার জন্যই অপেক্ষা করে যাচ্ছে, কবে দেখা পাবেন,কোন কলেজে পড়ায় এখানে, সব খোঁজ নিতে নিতে ঠিক পেয়ে যাবে, তার অপরিণত বয়েসের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে। 
সেদিন শনিবার ছিল, পরের দিন রোববার, ছুটি আছে, মনকলি চম্পাকে সাথে নিয়ে কাছেই একটা স্থানীয় বাজার আছে, সেই বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র যেমন আাল্ ডাল, আটা, ময়দা, বিস্কুট, পাঁউরুটি, দুধ, মাখন আর রান্নার জন্য তেল মশলা। এখানে দুটো গ্যাস স্টোভ দেওয়া হয়েছে তাকে। সব কিছু কিনে আনার পর চম্পা বলল,কি আঁধবো দিদিমণি? 
মনকলি খুব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে, হেমন্তের বাতাস বইতে শুরু করলেও দিনের বেলাটায় মাথার ওপর সূর্য দেব বেশ গনগনে আগুনের হল্কা ছঠান, কিন্তু বাড়িতে ঢুকলেই একটা সুন্দর শীতলতা অনুভূত হয়। মনকলি বলল, আগে একটু খাওয়াবে? 
উ মা দিদি কি বইলছেক দিখ!  খাওয়ামি না ক্যনে,? মু অহনি আনসি। 
একটু পরে সে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো, 
মনকলি বললো তুমিও একটু চা বিস্কুট নিয়ে বসো আমার কাছে, 
উ মা দিখ কাণ্ড, অহন বইলে আঁধবো টা কহন গো? 
- আরে রাঁধবে রাঁধবে, তরি তরকারি তো কিছুই কেনা হয়নি, ডাল আর চাল দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলো, 
- তুমি তো ঘুরে কিছুই দিখ লাই গো, পিছনের উঠনের লগে কি সোন্দর ফুল, ফল, সবজির গাছ আছে জানো? 
- উ বাজার টা থিকা আলুটা, কিনলেই হবেক অনে, আমাগো বাড়িতে উঠোনে মুরগির ঘরটা বানাইছে বুধনের বাপটা, উহান থিকা ডিম, মাংস টস লিয়ে আসতে পারবোক অনে, বুধনের বাপটা তো লতুন দিদিমণির জন্য কডা ডিম পাঠায় দিসে, খেইয়ে দিখ, দেশি মুরগীর সোয়াদটাই ভালোটা অছে গোন।
এরপর মনকলি বললো ঠিক আছে খিচুড়ির সাথে ডিমভাজা করে নিও তোমার আর আমার করে নিও, 
- লারে দিদি আমাকে ঘরকে যেইয়েই খাইতে, কামে অসছি বলেক মরদটা মুর আন্না করসে, না খাইলেক বহিত গরমটা দেখাইবেক। 
আচ্ছা চম্পা এখানে কলেজের কোনো মাস্টারমশাইকে জানো যিনি খুব গান করেন? 
- লা তো মু তো জানিক লাই রে, মু মোর মরদটাকে শুধাইবো অনে। 
চায়ের কাপ নিয়ে মনকলি উদাস হয়ে যায়,  নিজের মনেই বলে, বড়ো ভুল করেছিলাম সেদিন  তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বউয়াদা, কোন অভিমানে  তুমি কোথায় চলে গেলে, তুমি কি জানো, তোমার  মিতুল আজ পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তুমি এখানেই আছো এই খবর পেয়েই তো আমি এখানে চলে এসেছি, তোমাকে খুঁজে পাবো তো বউয়াদা!  
ক্রমশ

Friday, 27 January 2023

অন্য শ্রাবণ

পারমিতা চ্যাটার্জী

শ্রাবণের শুরু হতেই মনটা কিছু পাওয়ার নেশায় মেতে ওঠে, কখনও বা হারাই হারাই হয়-- কি যেন হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের বৃষ্টি ভেজা প্রাঙ্গন থেকে।
প্রতি শ্রাবণই নিয়ে আসে নতুন ভেজা ফুলের গন্ধ --
শ্রাবণ শেষে সে গন্ধটাও মিলিয়ে যায়--
জীবন থেকে এক একটা শ্রাবণ হারিয়ে যাচ্ছে -- কোথায় কোনখানে?  কে তার খবর রাখে--।
মনকে বলি -- মন মেনে নাও এই হারিয়ে যাওয়া -- হারিয়ে তো যাবেই জীবন তাকিয়ে থাকবে আবার আগামী শ্রাবণের দিকে -- কি খবর নিয়ে আসে সেই অপেক্ষায় --।
তিথি কলেজ থেকে ফিরে একমনে বৃষ্টি দেখছিল-- এই শ্রাবণের বৃষ্টিতেই সে জীবনের অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছিল আবার পেয়েওছিল অনেক কিছু--- শ্রাবণের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় সে হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে অনুপমের কাছে-- দুজনে একই কলেজে পড়ত--- অনুপম তার থেকে দুবছরের সিনিয়র ছিল-- সে ছিল বিজ্ঞানের ছাত্র,  আর তিথি ছিল একবারেই বিপরীত মেরুর ছাত্রী -- দর্শন নিয়ে সে এম এ পাশ করেছে--- তাও কি করে যে দুজনে দুজনের প্রেমে পরে গিয়েছিল তা আজ আর মনে পরেনা--। হারিয়ে যে কেন গিয়েছিল কি এক অমোঘ টানে, আজ তিরিশ বছর পরেও তা মনের ক্যানভাসে ছবি হয়ে জেগে ওঠে একটি হারিয়ে যাওয়া শ্রাবণ সন্ধ্যা। 
ঘটনার পরের দিনই অনুপম তাকে নিয়ে গিয়ে কালি মন্দিরে  বিয়ে করে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল --। পরের দিন বাড়ী চলে গিয়েছিল-- ওর বাবা কৃষ্ণনগরে থাকত--  ওখানকার খুব নাম করা উকিল ছিল-- তাছাড়া ওখানে ওদের অনেক জমিজমা ও ছিল-- এককথায় বলতে গেলে খুবই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে-- ও কলকাতায় মেসে থেকে পড়াশোনা করত। আর তিথির বাবা ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ অফিসার-- মাও একজন নামকরা স্কুলের টিচার। -- ওদের পরিবার মানে বাবা মা দুজনেই খুবই আধুনিক মনষ্কের মানুষ ছিলেন।
তারপর দিন থেকে আর অনুপমকে দেখতে পায়নি --। অনেকদিন পর তাদের এক কলেজের বন্ধুর হাত দিয়ে অনুপম একটা চিঠি পাঠিয়েছিল-- তাতে লেখা ছিল বাড়ী এসে দেখে মা তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছেন সামনের মাসেই বিয়ে-- তাদের সব কথা শুনে বললেন এ বিয়ে না করলে মায়ের মরা মুখ দেখতে হবে-- প্রথম চারদিন মাকে একফোঁটা জল ও খাওয়ানো যায়নি-- বাধ্য হয়ে সে বিয়েতে মত দেয়-- তারপর মা উঠে জল খান--।
আমার কিছু করার ছিলনা-- কিন্তু এই বেড়া একদিন আমি ভেঙে ঠিক তোমার কাছে পৌঁছে যাবো --। সে আজ তিরিশ বছর আগের কথা--। তারপর থেকে জীবনের এক একটা শ্রাবণ চলে যাচ্ছে অনুপম আর আসেনি--।
তিথির বাবা মাই সব দায়িত্ব নিয়ে মানুষ করেন শায়ন কে -- তার আর অনুপমের সন্তান -- অনুপম শায়নের অস্তিত্বের কথা জানেও না, তিথি ও আর জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি।

অনুপমের কথা--
তিথি আমি জানি তোমার কাছে আমি এখন জগতের সবচেয়ে ঘৃণ্য মানুষ কিন্তু আমি যে কতখানি নিরুপায় ছিলাম তা একমাত্র ভগবানই জানেন-- চারদিন ধরে নিজের মাকে একফোঁটা জল না খেয়ে দেখেও আমি অবিচল ছিলাম কিন্তু যখন দেখলাম মায়ের প্রেসার ফল করছে, বাবা এসে বললেন -- মাকে না মেরে কি শান্তি হচ্ছেনা?  বাধ্য হলাম তখন নিজের ভালোবাসাকে বলি দিতে।
আমি আমার মনের কথা কাউকে বোঝাতে পারিনি-- তুমিও হয়তো বুঝবেনা -- তাই আমার চিঠির কোন উত্তর পাইনি--। জানিনা তুমি কোথায় আছ,  কেমন আছ?
প্রাণহীন ভালোবাসা হীন একটা সংসার জালে আবদ্ধ থাকা যে কি যন্ত্রণার তা কেউ বুঝবেনা--।
কিন্তু আজ এতদিন পর তোমার কথাই বসে ভাবছি তুমি জানতেও পারবেনা-- আমার শুধু মনে হয় ভেঙে গেছে আমার শ্রাবণের ভালোবাসা -- ভেঙে ফেলেছি প্রতিশ্রুতি, শ্রাবণ সন্ধ্যায় বিবাহের অঙ্গীকার -- তোমার কাছে যাবার মতন মুখ আর নেই -- কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবো তোমার কাছে? আমার চোখে এখনও তুমি সেই লম্বা বিনুনি বাঁধা চন্চলা তরুণী -- নাই বা দেখলাম তোমার বার্দ্ধক্যর ছবি--। একটা কথা স্বীকার না করে পারছিনা আমার  স্ত্রী শ্রুতি বড় ভালো আর সরল মেয়ে -- তোমার কথা ওকে আমি সব বলেছিলাম -- ও সব নিঃশব্দে মেনে নিয়ে আমায় ভালোবেসেছে-- আমায় অনেক বার বলেছে তোমার খোঁজ করতে,  আমিও খুজে ছিলাম, পাইনি তোমায় আর--। 
শ্রুতিকে  দুবছর ছুঁই নি -- কিন্তু ওর সহ্যশক্তি মায়া মমতা, গোপন অশ্রু সব আমায় ভুলিয়ে দিল-- কখন যেন নিজের অজান্তেই ওর কথা ভাবতে শুরু  করলাম--- ভাবছো তো? কি অমানুষ আমি? কিন্তু তিথি তুমিই বল-- ওর তো কোন দোষ ছিলনা-- তবুও নিজের অধিকার নিয়ে কখনও আমায় বিব্রত করে তোলেনি-- নিঃশব্দে সব মানতে মানতে একদিন কঠিন নার্ভের অসুখের শিকার হয়-- দুটো মেয়ের জীবন আমার জন্য নষ্ট হচ্ছে?  নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করি-- আমি কি? আমি কি মানুষ?  সেদিনের শ্রাবণ সন্ধ্যার বৃষ্টিভেজা স্মৃতি না হয় মিথ্যা হয়ে যাক একজনকে অন্তত ভালো ভাবে বাঁচতে সাহায্য করি-- এরপরই দুঃখী নিরপরাধ মেয়েটাকে কাছে টেনে নিয়ে তাকে স্ত্রীর সম্মান দি-- ভালো হয়তো বাসতে পারিনি--- কিন্তু তার প্রতি মায়া মমতা, স্নেহর আমার কোন অভাব ছিলনা-- আমাদের একটি কন্যা সন্তানও হয়--। 
শ্রুতিকেও বেশিদিন আমি ধরে রাখতে পারিনি-- দীর্ঘদিনের অযত্নে অবহেলায় ভেঙে পরা শরীর আর জোড়া লাগলো না -- শ্রুতি চলে গেলে আমায় ছেড়ে -- যেন এক চরম শাস্তি দিয়ে গেল-- যাওয়ার আগে আমায় বলে গিয়েছিল-- " আর তো কোন বাধা রইল না, এবার দিদিকে ভালো করে খুজে নিয়ে এসো--।
না সত্যি কথা বলতে আজ আর দ্বিধা করবনা তোমায়-- আমি শ্রুতির স্মৃতিকে মেরে ফেলতে চাইনি-- বরং খুব যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছি---।
শুধু এই শ্রাবণ সন্ধ্যা গুলোয় মনটা তোমার কাছে চলে যায়-- অপেক্ষায় থাকি এক শ্রাবণ চলে গেলে আর একটা শ্রাবণের--।

তিথি জানলা ধরে শ্রাবণের বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবছে এই শ্রাবণটাও চলে যাবে-- আসবেনা কেউ--।

নীরব অভিমান

Paromita creationনীরব অভিমানে
পারমিতা চ্যাটার্জী 

পায়ে পায়ে এসেছিলাম চলে অনেকটা দূরে,
মাঝপথে দেখা হয়েছিল তোমার সাথে,
তুমি ডাক দিয়েছিলে আমায়,
পথের মাঝে  বটগাছের ছায়ায়
আমরা নিয়েছিলাম ভালোবাসার আশ্রয়।
তারপর হাত ধরে এগিয়ে গেলাম
আরো অনেকটা পথ,
বসন্তের উন্মত্ত বাতাসে 
দুজনেই এলোমেলো,
চাঁদ ওঠা বনজোছনায়,
হাসনুহানার গন্ধে জড়িয়ে নিলাম
একে অপরকে এক গভীর অনুভূতির আবর্তে।
হঠাৎ পধের বাঁকটা ভাগ হয়ে গেল দুদিকে,
আমরা চললাম ভিন্ন পথে,
বটগাছের তলায় ভালোবাসার ছায়াটা
আজো দুলে যায়,
বনজোছনার আলো নীরবতার কোণে
উকি দিয়ে যায়,
জানিনা কি বলতে চায়,
শুধু নীরবতা চেয়ে থাকে
নীল আকাশের দিকে,
ভালোবাসার নীরব অভিমানে।।

Sunday, 22 January 2023

বঙ্গ মায়ের বীর সন্তান

 বঙ্গমায়ের বীর সন্তান 

পারমিতা চ্যাটার্জি 


পরাধীন ভারতমাতার শৃঙ্খল উন্মচনে যখন উদভ্রান্ত চরমপন্থী ভারতের বিপ্লবী দল,

যখন তাদের সামনে একটাই দিশা ভারতমাতার মাটিতে পুঁততে হবে স্বাধীন ভারতের পতাকা, 

তখনই ঠিক তখনই ভেসে এলো এক দৃপ্ত কণ্ঠস্বর 

" তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো "। 

কে সেই মহান নেতা যাঁর বজ্র গম্ভীর কণ্ঠস্বর জানিয়ে দিলো,এখন এসেছে সময়, অস্ত্রের বদলে অস্ত্র ধরার, 

হ্যাঁ তিনিই আমাদের নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ভারত তথা বঙ্গমায়ের বীর সন্তান আমাদের ঘরের ছেলে সুভাষ চন্দ্র বসু। 

আপোষহীন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সমস্ত শক্তি নিয়ে,

 তরুণ বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করলেন মায়ের হাতের শৃঙ্খল উন্মোচনে। 

দূর্বিনীত স্বৈরাচারী ইংরাজ শাসক বারবার অক্ষম  হয়েছে তাঁকে দাবিয়ে দিতে, 

কারাবন্দী জীবনের যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে আবার নতুন উদ্যমে উন্নত শিরে এগিয়ে গিয়েছেন লক্ষ্য  পূরণে। 

চোখে শুধু একটাই স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে, চাই স্বাধীনতা, " মানবেনা ভারতবাসী আর বিদেশি শক্তির অপশাসন "। 

অপারগ ইংরেজ সরকার তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখলেন, 

বন্দী থাকার মানুষ তো তিনি নন,

ছদ্মবেশে শাসকের চোখে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেলেন কাবুল আফগানিস্তান পেরিয়ে সুদূর বার্লিনে, 

সবাই যখন জানে সুভাষ চন্দ্র নিরুদ্দেশ, 

চতুর্দিকে তাঁর খোঁজ চলছে, 

বিপ্লব কি তাহলে ঝিমিয়ে যাবে! 

ঠিক তখনই বার্লিনের রেডিও থেকে ভেসে এলো, 

সেই পরিচিত দৃপ্ত কণ্ঠস্বর, " আমি সুভাষ বলছি"। 

জার্মান থেকে সাবমেরিনে জাপানে এসে পৌঁছে 

গড়ে তুললেন বন্দী ভারতীয়দের নিয়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তাঁর সৈন্যদল, আজাদ হিন্দ ফৌজ। 

প্রবল শীত, অন্ধকার পাহাড়ের পথ, খাদ্য নেই, নেই বস্ত্র, 

আছে শুধু তাদের নেতার দেখানো স্বাধীন দেশের 

স্বপ্নের অঞ্জন চোখে, 

তাই নিয়ে এগিয়ে চলেছে বীর সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজের বাহিনী। 

আসতে আসতে তারা প্রায় চলে আসে ইম্ফলে,

তুলে ধরেন স্বাধীন ভারতের পতাকা, 

প্রায় দেশ স্বাধীনের মুখে, হঠাৎ এলো সেই ভয়ংকর খবর, নেই!  

আমাদের ভারত মায়ের বীর সন্তান নেতাজি সুভাষ আর নেই, 

তাঁর নাকি মৃত্যু হয়েছে, প্লেন ক্র্যাশেব!

এ যে মিথ্যা, নিদারুণ মিথ্যা, 

কোথায় গেলেন সুভাষ!  জানা গেলো সেদিন কোনো প্লেন ক্র্যাশ হয়নি, 

তাহলে!  এই তাহলে প্রশ্নের উত্তর আজও ভারতবাসীর কাছে অজানা, 

আজও ভারতবাসী জানেনা, ভারতের স্বাধীনতা যাঁর জন্য এসেছিল সেই বীর সুভাষ আর কোনদিন ফিরে আসেন, 

উত্তর দিতে পারেন নি, তদানিন্তন ভারতের রাষ্ট্রীয় নেতারা, 

না কি উত্তর দিতে চাননি, এ প্রশ্ন এখনও প্রশ্নই থেকে গেছে, 

শুধু জানি আমাদের বঙ্গমায়ের বীর সন্তান আার ফিরে আসেন নি। 

ভারতবাসীর হৃদয়ে আজও তিনি উজ্জল, আজও ২৩শে জানুয়ারি এলেই আপনি প্যারেডের তালে তালে পা চলে, " কদম কদম বাড়ায়ে যা, খুশিকে গীত গায়ে যা, ইয়ে জিন্দেগী কি কৌম কি, তু কৌম পর লুটায়ে যা "।।

Saturday, 21 January 2023

প্রথম প্রেম

 


প্রথম প্রেম

অনুগল্প

পারমিতা চ্যাটার্জি 



এখনও মনের কোণায় পড়ে আছে ফেলে আসা পথের শেষ রেখা খানি। বিশ্বাস কর অমিতাভ এখনও তোমাকে খুঁজি  তোমাদের সেই চতুষ্কোণ তিনতলার বারন্দায়। যেখানে তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে আমাকে দেখার জন্য। আমাদের স্কুল বাসটা ওখান থেকেই আমাকে তুলতে আসতো। আবার যখন ফিরতা তখনও দেখতাম নির্নিমেষ তুমি দাঁড়িয়ে আছো সেই বারন্দায়। আমার অজান্তেই চোখ দুটো চলে যেতো রাস্তা থেকে একফালি তিনতলার বারন্দায় যেখানে একটি ছেলে তার ভালোবাসার দৃষ্টি  মেলে আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতো। সেদিন বাড়ির ভয় যে কথা বলতে পারিনি তা আজ জীবনের শেষবেলায় এসে খুব বলতে ইচ্ছে করছে। তুমি  জানোনা যে আমি ঘুরেফিরে আবার আমার সেই ছোট্ট বেলার পাড়ায় এসে ঘর বেঁধেছি। জানিনা তুমি এখনও ও বাড়িতে আছো কি না বা কোথায় আছো?  কেমন আছো? 

তৃষ্ণার্ত চোখে তাই যাতায়াতের পথে বাড়িটার দিকে চেয়ে তোমাকে খুঁজি। হয়তো অনেক বদলে গেছো তাই চিনতে পারিনা। হয়তো তুমিও আমার মতন দাদু হয়ে গেছো। সবটাই হয়তোতেই আটকে আছে। 

দেখা হলে একবার তোমাকে বলে যেতাম যে আমিও ভালো বেসেছিলাম। তাইতো জীবন সায়াহ্নে এসে তোমায় খুঁজি তোমার জায়গায়। কিন্তু পাইনা। জানিনা আদৌ কোনদিন পাবো কি না!  যেখানেই থাকো খুব ভালো থেকো আর পারলে মনে করার চেষ্টা কোরো, বারন্দায় দাঁড়িয়ে স্কুল যাতায়াতের সময় একটি মেয়ের অপেক্ষায় থাকতে শুধু তাকে একবার দেখবে বলে। সেই মেয়েটিও এখন প্রায় বৃদ্ধাই বলা চলে তবুও তার অবুঝ মন খুঁজে চলে প্রথম যৌবনের অসম্পূর্ণ প্রেমকে।