বিয়ের তারিখ
পারমিতা চ্যাটার্জী
গান শিখতে গিয়ে জয়তী ভালোবেসেছিল সুজিতকে।
ভালোবেসে আবদ্ধ হয়েছিল বিবাহ বন্ধনে কোন এক শুভ লগ্নে। ভালোবেসে ছিল সাধারণ সুজিতকে। অর্থের দৈনতা কেড়ে নিতে পারেনি তাদের নিঃস্বার্থ প্রেমকে। প্রতি বিয়ের তারিখে তারা দুজনে হারিয়ে যেত এখানে সেখানে। বলেছিল সুজিত এ দিনটা শুধু তোমার আমার আর কেউ থাকবেনা আমাদের মাঝে। দুজনের ভালোবাসায় জয়তীর কোল আলো করে জন্ম নিয়েছিল তাদের কন্যা দিশা। দিশাকে ভালো রাখবে বলে সুজিতকে পেয়ে বসে উচ্চাশার নেশায়। সে ছুটেছিল অর্থের পেছনে। ছুটতে ছুটতে সে ভুলে গেল সেদিনের অঙ্গীকার ভালোবাসার নেশা। এই বৈভব ভালো লাগতনা জয়তীর। সে বলল, কি হবে এমন পয়সায় যেখানে সংসার হয়ে যাচ্ছে এক প্রাণহীন যন্ত্র? উত্তরে সুজিত তাকে বলেছিল সময়ের সাথে নিজেকে বদলে ফেল না হলে কষ্ট পাবে--
- কষ্ট তো পাচ্ছি মনে হচ্ছে যে মানুষটাকে ভালোবেসে সব ছাড়লাম সে মানুষটাকেই তো হারিয়ে ফেলেছি--
-মানুষটা একই আছে এখনো আমরা বিয়ের তারিখ একলা কাটাই-
- হ্যাঁ কাটাই কিন্তু নিয়মের বেড়াজালে ---
-- মানে কি চাও তুমি? দামী অর্কিড নিয়ে আসি, নিয়ে আসি দামী উপহার, বড় হোটেলে খেতে নিয়ে যাই সবই তো করি তোমার ভালো লাগবে বলে--
-- আসলে কি বল তো সুজিত তুমি মানুষটাই বদলে গেছ তাই আমার ভালোলাগাটাও ভুলে গেছ--
-- আমার সেই প্রথম ভালোবাসার ঘরে তোমায় আমি অনেক কাছে পেতাম, আমার সেই সুজিত আমার জন্য সাদা টাটকা রজনীগন্ধার স্তবক আনত আমি তাকে সাজিয়ে রাখতাম কাঁচের গ্লাসে, আমরা ঘুরে বেড়াতাম এলোমেলো এখানে সেখানে, খেতাম অনাদি কেবিনের মোগলাই পরোটা--
-- অবস্থার পরিবর্তন তো হয়ই সেই পরিবর্তনটাকে মানিয়ে নিতে হয় এটাই নিয়ম, যাক অনেক রাত হয়েছে কাল আমায় টুরে যেতে হবে এবারের টুর একমাসের --
-- একমাসের জন্য বাইরে চলে যাচ্ছ আর আমায় আগের দিন জানাচ্ছ?
- আরে আমি নিজেই তো সবে জানলাম টাকাপয়সা সব রেখে যাচ্ছি তোমাদের কোন অসুবিধা হবেনা, তাছাড়া তোমার তো গান শেখানো আছেই যেন টিউশনের টাকাটা না পেলে খেতে পাবেনা। জয়তী স্তব্ধ হয়ে গেল কান্নায় তার গলা বুজে এলো তবু কান্নাধরা গলায় বলল আজকাল তো বেশীরভাগ সময় বাইরেই কাটাও তোমার সেক্রেটারি নীপার সাথে-
-- জয়তী বোকার মতন কথা বোলনা নীপার সাথে আমার কাজের সম্পর্ক যাক রাত হয়েছে অনেক নিজেও ঘুমোও আমাকেও ঘুমোতে দাও ভোরের ফ্লাইট ধরতে হবে বলে সুজিত পাসফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পরে। জয়তীর চোখে তখন ধারা শ্রাবণ তারমানে একমাসের আগে ফিরবেনা আর কুড়িদিন পর তাদের বিয়ের তারিখ সেটাও তাহলে সুজিত এবার ভুলে গেল।
সুজিত চলে যাবার পর জয়তী ঠিক করল ওই তারিখে ও যদি সত্যি নাআসে তবে জয়তী মেয়ে নিয়ে বাপেরবাড়ী চলে যাবে।সুজিতের হয়ত তাতেও কিছু যায় আসবেনা বলবে তোমাদের খাওয়া পড়ার খরচ দিয়ে দেব, নিজে এখন উগ্র আধুনিক নীপাকে নিয়ে খুব ভালো থাকবে যতই হোক জয়তীতো এখন পুরানো হয়ে গেছে না?
কুড়ি দিন পর তাদের বিয়ের তারিখ দেখতে দেখতে এসে গেল। শেষ মুহূর্ত অবধি অপেক্ষা করে যখন সুজিত এলোনা জয়তী তখন ঠিক করল সকালে উঠেই চলে যাবে সুটকেস গুছিয়ে নিল। ভোরবেলা উঠে এক কাপ চাখেয়ে বাথরুমে গেল। বাথরুম থেকেই শুনতে পেল তার ফোন বাজছে। তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে এসে ফোনটা ধরতেই দেখল ওটা সুজিতের ফোন কোনরকমে বলল, হ্যালো----
হ্যালো হ্যাপি এ্যানিভারসারি--
-- ও ফোনেই সেরে দিচ্ছ---
-- কি করব বল যা কাজের চাপ--
-- তুমি থাকো তোমার কাজ নিয়ে আমি চললাম আমার বাপেরবাড়ী--
-- ও তাই যাও এখানে তোমার খুব একা লাগে আমি বুঝতে পারি--
জয়তীর রাগে আর মুখ দিয়ে কোন কথা বার হলনা ফোনটা কেটে দিয়ে বিছানায় ছুটে গিয়ে কান্নায় লুটিয়ে পড়ল। তিনমিনিটের মধ্যে দরজায় বেল।
-উফ্ কে আবার এলো এখন নিশ্চই দুধওয়ালা একটু ভালো করে কাঁদতেও দেবেনা।
দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল এ গোছা সাদা টাটকা রজনীগন্ধা নিয়ে সুজিত দাঁড়িয়ে হাসছে। জয়তী অনেকদিন পরে ঝাঁপিয়ে পরল সুজিতের বুকের ওপর, ' তুমি খুব বাজে', সুজিতও ওকে সবলে নিজের বুকে চেপে ধরে বলল আর তুমি খুব বোকা একদম বোকা মেয়ে একটা।
No comments:
Post a Comment